আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুদ্ধবিরতির আলোচনা সচল থাকার মধ্যেই দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই সংঘাতে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ হামলায় এক প্যারামেডিকসহ অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে হিজবুল্লাহ প্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করলেও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা থামছে না।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি সামরিক অভিযানে হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সর্বশেষ রোববার দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এতে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ইসলামিক হেলথ কমিটির এক প্যারামেডিকসহ দুইজন প্রাণ হারান। এর আগের দিন দক্ষিণাঞ্চলীয় সির আল-গারবিয়েহ এলাকায় একটি আবাসিক এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় ছয় নারী ও এক শিশুসহ ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। লেবানন সরকার এই ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকার ৩০টিরও বেশি স্থানে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান থেকে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো থেকে তীব্র ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। নাবাতিয়েহ অঞ্চলে লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের একটি স্থাপনা ইসরাইলি বোমাবর্ষণে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জরুরি সরঞ্জাম ও চিকিৎসাসামগ্রী উদ্ধারে কাজ করছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এই সুনির্দিষ্ট হামলার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তারা দাবি করেছে, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেবল হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হানা হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের এক ডজনেরও বেশি গ্রামের বাসিন্দাদের অবিলম্বে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। সামরিক বাহিনীর এই সতর্কবার্তার পর ওই অঞ্চলের বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে স্থল অভিযানের পরিধি বাড়াতেই এই উচ্ছেদ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও দক্ষিণ লেবাননে অনুপ্রবেশকারী ইসরাইলি সেনা এবং সীমান্ত সংলগ্ন ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে প্রতিরোধমূলক হামলা অব্যাহত রেখেছে। গোষ্ঠীটি রোববার একদিনেই রকেট, ড্রোন ও কামান ব্যবহার করে ইসরাইলি অবস্থান লক্ষ্য করে ২০টিরও বেশি হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে। হিজবুল্লাহর দাবি, ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিহত করতে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের এই প্রতিরোধ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
কূটনৈতিক স্তরে হিজবুল্লাহ প্রধান মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা বা চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সংঘাতের তীব্রতা কমেনি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক চাপ এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা প্রতিরোধ কেবল লেবাননের অভ্যন্তরেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিতে ফেলছে। এই অঞ্চলের মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়া রোধে অবিলম্বে একটি কার্যকর ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।