আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। দেশটিতে ইতিমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। কঙ্গোর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট ৯০৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১১৯ জন। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে কঙ্গোর জন্য অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সতর্ক করেছে। তবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও সংস্থাটি জানিয়েছে যে, এই ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বর্তমানে কিছুটা কম।
কঙ্গো সরকারের জন্য এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ ও সহিংসতা মহামারি দমনের প্রধান অন্তরায়। সম্প্রতি দেশটির পূর্বাঞ্চলের দুটি প্রধান শহরে ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বছরের পর বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সহিংসতা, লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতির কারণে সরকারের প্রতি স্থানীয় মানুষের গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি কঙ্গোর ঐতিহ্যবাহী দাফন পদ্ধতির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় জনমনে ক্ষোভ আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ। অঞ্চলটি এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেখানে আইএস এবং রুয়ান্ডা-সমর্থিত ‘এম২৩’ সহ একাধিক শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কারণে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। সংঘাতের কারণে ইতুরিতে ইতিমধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মতে, আগে থেকেই ভঙ্গুর এই জনবসতির মধ্যে ইবোলার সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ঘনবসতিপূর্ণ বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে রোগটি ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর্থিক অনুদান কমিয়ে দেওয়া এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো কঙ্গোয় তাদের স্বাস্থ্য খাতের সাহায্য সংকুচিত করায় দেশটির মহামারি শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মরত হাসপাতাল ও সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ফেস শিল্ড, বিশেষ পিপিই স্যুট, টেস্টিং কিট কিংবা লাশ দাফনের জন্য বডি ব্যাগ নেই। বর্তমানে নার্স ও সম্মুখসারির কর্মীরা কেবল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলার এই নির্দিষ্ট ‘বান্দিবুগিও’ (Bundibugyo) ধরনের কোনো অনুমোদিত টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরই একমাত্র ভরসা করতে হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন বর্তমানে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সব ধরনের শোকসভা এবং ৫০ জনের বেশি মানুষের যেকোনো সমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।