খেলাধূলা ডেস্ক
ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় স্তর ‘চ্যাম্পিয়নশিপ’-এর প্রমোশনাল প্লে-অফ ফাইনালের নাটকীয় জয়ে দীর্ঘ এক দশক পর ঐতিহ্যবাহী ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে (ইপিএল) নিজেদের স্থান নিশ্চিত করেছে হাল সিটি। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ভাগ্যনির্ধারণী ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে (৯৪তম মিনিটে) স্ট্রাইকার অলি ম্যাকবার্নির জয়সূচক গোলে মিডলসবোরোকে পরাজিত করে ক্লাবটি শীর্ষ স্তরের ফুটবলে আরোহন করে। এই জয়ের ফলে আগামী মৌসুম থেকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও লাভজনক ফুটবল লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবে হাল সিটি।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল প্রদর্শিত হয়। তবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলমুখ খুলতে পারেনি। ম্যাচের ভাগ্য যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়। ডান প্রান্ত থেকে হিরাকাওয়ার বাড়ানো একটি দূরপাল্লার ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন মিডলসবোরোর গোলরক্ষক। তাঁর হাত থেকে ফস্কে যাওয়া বলটি গোলবক্সের সুবিধাজনক স্থানে পেয়ে যান হাল সিটির ফরোয়ার্ড অলি ম্যাকবার্নি। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন এই ফুটবলার। এই একমাত্র গোলের ওপর ভর করেই প্রিমিয়ার লিগে ফেরার উৎসবে মাতে হাল সিটির খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা।
চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপের প্রমোশনাল ফাইনাল প্লে-অফে মিডলসবোরোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া নিয়ে মাঠের বাইরে বেশ বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ফুটবল অঙ্গনে ‘স্পাইগেট কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত একটি অনৈতিক ঘটনার দায়ে সাউদাম্পটন ফুটবল ক্লাবকে টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর ফলে আকস্মিকভাবেই প্লে-অফে খেলার সুযোগ পায় মিডলসবোরো। আকস্মিক এই সুযোগের কারণে ক্লাবটির মাঠের পারফরম্যান্সে প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে, যা শেষ পর্যন্ত ফাইনালের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা।
হাল সিটির জন্য প্রিমিয়ার লিগে ফেরার এই যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৬-১৭ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমিত (রেলিগেশন) হওয়ার পর ক্লাবটিকে দীর্ঘ ও কঠিন এক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। একপর্যায়ে দলটির পারফরম্যান্সের এতটাই বিপর্যয় ঘটে যে, তারা তৃতীয় স্তর বা ‘লিগ ওয়ান’-এ নেমে গিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে ক্লাবের মালিকানা পরিবর্তন, কোচের রদবদল, প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা এবং মাঠের ধারাবাহিক হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে প্রতি মৌসুমেই শীর্ষ লিগে ফেরার স্বপ্ন অধরা থেকে যাচ্ছিল দলটির।
ক্লাবটির এই ঐতিহাসিক পুনরুত্থানের পেছনে মূল কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রধান কোচ সার্গেজ জাকিরোভিচকে। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পরই মূলত ঘুরে দাঁড়ায় হাল সিটি। বিগত ২০২৪-২৫ মৌসুমে দলটির পারফরম্যান্স এতটাই শোচনীয় ছিল যে, তারা কোনোক্রমে রেলিগেশন এড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে জাকিরোভিচের কৌশলগত পরিবর্তন ও খেলোয়াড়দের মানসিকতায় ইতিবাচক রূপান্তরের ফলে দলটি একটি লড়াকু শক্তিতে পরিণত হয়। নিয়মিত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পয়েন্ট টেবিলের ষষ্ঠ স্থানে থেকে তারা প্লে-অফ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
সেমিফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ দুই লেগের লড়াইয়ে শক্তিশালী মিলওয়ালকে সামগ্রিকভাবে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করে ফাইনালে পা রেখেছিল হাল সিটি। ফাইনালে মিডলসবোরোর বিপক্ষে এই নাটকীয় জয় ক্লাবটির ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হওয়ার ফলে হাল সিটি কেবল ক্রীড়াতাত্ত্বিক সাফল্যই পায়নি, বরং এর ফলে ক্লাবটির টেলিভিশন স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি বাবদ কয়েকশ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল আর্থিক রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত হলো, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্লাবটির পেশাদার কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।