ক্রীড়া প্রতিবেদক
ইউরোপীয় ফুটবলের চলতি মৌসুমের শেষ ম্যাচে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে অ্যাথলেটিক ক্লাবকে ৪-২ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করেছে। ম্যাচটি কেবল মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রিয়াল মাদ্রিদের দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মঞ্চ হিসেবেও এটি ফুটবল ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বিদায় ও জয়ের এই দ্বিমুখী আবহে ম্যাচটি দর্শক ও ফুটবল বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই রিয়াল মাদ্রিদ শিবিরে এক ধরনের বিদায়ী পরিবেশ বিরাজ করছিল। দলটির কোচ আলভারো আরবেলোয়া আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে, আগামী মৌসুমে তিনি আর ক্লাবের কোচের দায়িত্বে থাকছেন না। একই সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য রক্ষণভাগের দুই স্তম্ভ—অধিনায়ক দানি কারভাহাল এবং অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ডেভিড আলাবাও এই ম্যাচের মাধ্যমে ক্লাবের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফলে ঘরের মাঠে এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে একটি স্মরণীয় জয় উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে লস ব্লাঙ্কোরা।
খেলার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের মাত্র ১১ মিনিটেই প্রথম সাফল্যের দেখা পায় স্বাগতিকেরা। বিদায়ী অধিনায়ক দানি কারভাহালের একটি নিখুঁত ও দূরদর্শী পাস থেকে বল পেয়ে অ্যাথলেটিক ক্লাবের রক্ষণভাগ ভেঙে গোল করেন তরুণ ফরোয়ার্ড গনসালো গার্সিয়া। এই গোলের পর রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে এসে রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণের ধার আরও বৃদ্ধি পায়। ফলস্বরূপ, দলের ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের একক নৈপুণ্যে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্বাগতিক দল। তবে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও অ্যাথলেটিক ক্লাব হাল ছেড়ে দেয়নি। প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তারা একটি গোল শোধ করতে সক্ষম হয়। ইনাকি উইলিয়ামসের চমৎকার একটি ক্রস থেকে বল পেয়ে ডান পায়ের নিখুঁত শটে গোল করেন অ্যাথলেটিক ক্লাবের স্ট্রাইকার গোরকা গুরুজেতা। ফলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই রিয়াল মাদ্রিদ পুনরায় ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ৫১ মিনিটে ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে দলের পক্ষে তৃতীয় গোলটি করেন। এই গোলের মাধ্যমে চলতি মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এমবাপ্পের গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯-এ, যা তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্সের নজির। ম্যাচের শেষ ভাগে ব্রাহিম দিয়াজ আরও একটি গোল করলে রিয়ালের জয় সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবে অতিরিক্ত সময়ে অ্যাথলেটিক ক্লাব আরও একটি গোল শোধ করলেও তা কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, রিয়ালের জয় আটকানো সম্ভব হয়নি।
ম্যাচের ফলাফল ছাপিয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দর্শকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ডেভিড আলাবা ও দানি কারভাহালের মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি। দ্বিতীয়ার্ধের শেষের দিকে যখন এই দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছিল, তখন স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থক দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অবদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। এ সময় মাঠের ভেতরে দুই দলের খেলোয়াড়রা সমবেত হয়ে বিদায়ী অধিনায়ক দানি কারভাহালকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন, যা ফুটবলীয় সৌজন্যতাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জয়ের ফলে রিয়াল মাদ্রিদ একটি মিশ্র মৌসুমের ইতিবাচক সমাপ্তি টানতে সক্ষম হলো। চলতি মৌসুমে আশানুরূপ ট্রফি না পেলেও, শেষ ম্যাচে দলের এই পারফরম্যান্স আগামী মৌসুমের জন্য তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। একই সাথে আরবেলোয়া, কারভাহাল এবং আলাবার মতো অভিজ্ঞদের প্রস্থান ক্লাবের নতুন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পথ উন্মুক্ত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।