বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডিং, এসি টেকনিশিয়ান ও প্লাম্বিং—এই চার খাতের দক্ষ জনশক্তি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে কাতার। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কাতারের ভিসা সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দেশটির সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
সোমবার (১৮ মে) ঢাকায় সফররত কাতারের শ্রমমন্ত্রী আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররির সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে উভয় দেশের শ্রমবাজারের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজীকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কাতার বর্তমানে তাদের অবকাঠামো ও সেবা খাতের জন্য অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে সার্টিফাইড বা দক্ষ কর্মী নিয়োগে বিশেষ জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কাতারকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট খাতগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মী তৈরি করে পাঠানো হবে।
বৈঠক প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, কাতার মূলত ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডিং, এসি টেকনিশিয়ান ও প্লাম্বিং—এই চারটি সুনির্দিষ্ট সেক্টর নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা এখন অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও এই নীতিকে স্বাগত জানাচ্ছে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের মান বৃদ্ধির পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। কাতার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অন্যতম প্রধান একটি শ্রমবাজার। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমাম ও মুয়াজ্জিন কাতারে যেতেন, যা মধ্যবর্তী সময়ে কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। এই বৈঠকে কাতারে বাংলাদেশি ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সংখ্যা পুনরায় বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানানো হলে কাতারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, নতুন চিহ্নিত চারটি খাত ছাড়াও আরও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে কাতার সরকারের একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে এই সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে কাতারের মাত্র একটি ভিসা সেন্টার (কিউভিসি) কার্যকর রয়েছে। এর ফলে ভিসা প্রত্যাশীদের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে এবং একাধিকবার যাতায়াত করে নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। এই জনদুর্ভোগ লাঘব করতে বাংলাদেশে কাতারের আরও কয়েকটি ভিসা সেন্টার খোলার জন্য কাতারের শ্রমমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ভিসা সেন্টার বৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, একটি মাত্র ভিসা সেন্টার থাকায় সেবাগ্রহীতাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। এই সমস্যা সমাধানে সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে কাতারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামীতে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং কাতার সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
এদিকে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের অনিয়ম যেন না হয়, সে বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশে যেসব স্থানীয় এজেন্সির মাধ্যমে কাতারের ভিসা প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াকরণের কাজ সম্পন্ন হয়, তারা যেন সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের হয়রানি বা আর্থিক শোষণের শিকার না করে। অভিবাসন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও জনশক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাতারের মতো একটি বড় শ্রমবাজারে নতুন চার খাতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর এই সুযোগ বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ভিসা সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অভিবাসন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ হবে।