আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে নতুন করে ড্রোন হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এবং বন্ডের সুদ (ইল্ড) একলাফে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই আকস্মিক অস্থিরতার কারণে সোমবার (১৮ মে) লেনদেন শুরুর পরপরই এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা প্যারিসে একটি জরুরি বৈঠকে বসছেন।
খবর অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার পর সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যা এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। একই সময়ে সৌদি আরব তাদের আকাশসীমায় তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। এই ঘটনার পর মার্কিন প্রশাসন ইরানের প্রতি দ্রুত সমঝোতায় আসার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আগামী জুনের শেষ নাগাদ এই সংকট আরো ঘনীভূত হলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদি এই অবরোধ চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে, তবে ২০২৭ সাল নাগাদ প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।
জ্বালানি তেলের এই চড়া মূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে বন্ড বাজারেও তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদ ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪.৬৩১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি জাপানের সরকারি বন্ডের সুদ ১৯৯৬ সালের পর এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বন্ডের এই ঊর্ধ্বমুখী হারের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আরো বাড়িয়ে দিতে পারে, যা উৎপাদন খাতকে সংকুচিত করবে।
বিশ্ববাজারের এই নেতিবাচক ধাক্কায় জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক ‘নিক্কেই’ ১.১ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্টক সূচক ০.১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এশিয়ার বাইরেও এর প্রভাব পড়েছে সমভাবে; যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ০.৬ শতাংশ, নাসডাক ফিউচার ০.৮ শতাংশ এবং ইউরোপের ইউরোস্টক্স ফিউচার ১.০ শতাংশ কমেছে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের এই মন্দাভাবের মধ্যেই চলতি সপ্তাহে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এনভিডিয়া’ এবং মার্কিন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ালমার্ট’ তাদের প্রান্তিক আয়ের খতিয়ান প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনগুলো থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বাজারের ভবিষ্যৎ এবং চড়া জ্বালানি তেলের বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।