আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে তেহরানকে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরান যদি দ্রুত কোনো সমঝোতায় না আসে, তবে দেশটির জন্য এক ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
ট্রুথ সোশ্যালে লেখা বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ইরানকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সমঝোতার দিকে এগোতে হবে, অন্যথায় দেশটিতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সময় অপচয় করার মতো সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই বার্তা প্রকাশের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের কথা ছিল, যা এই অঞ্চলে চলমান কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতার গভীরতাকে নির্দেশ করে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ভিন্ন সুর প্রকাশ করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান সংঘাত নিরসনে এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইরান সর্বশেষ যে প্রস্তাব পেশ করেছিল, ওয়াশিংটন তার জবাবে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট বা ইতিবাচক ছাড় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই ধরনের নমনীয়তা ও সমঝোতার অভাবই মূলত চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে এক গভীর অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, যুদ্ধবিরতির স্থায়ী রূপরেখা নিশ্চিত করতে ইরানের পক্ষ থেকে প্রধানত তিনটি বড় দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, ইরানের বন্দর ও জলসীমার ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা এবং ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হবে না—এমন সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা প্রদান। একই সাথে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়েও ইরান বিশেষ জোর দিয়ে আসছে।
বিপরীতে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর কঠোর পাঁচটি শর্তারোপ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল শর্তগুলোর অন্যতম হলো, ইরান কেবল একটি মাত্র পারমাণবিক স্থাপনা সচল রাখতে পারবে এবং তাদের উৎপাদিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ মজুত ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি আগামী ২০ বছরের জন্য তাদের সমস্ত পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত রাখতে সম্মত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই শর্তের বিষয়ে বিকল্প কোনো প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনী যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে এক ব্যাপক বিমান হামলা পরিচালনা করে। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও পরবর্তীতে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল, তবে তা এ অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে পারেনি। বর্তমান আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় এবং ট্রাম্পের নতুন এই হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।