প্রবাস ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসন এবং অধিকার আদায়ে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। গত রবিবার সন্ধ্যায় উডসাইডের গুলশান ট্যারেসে বাংলাদেশ সোসাইটি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রবাসীদের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে পেশ করা হয়। সভায় মন্ত্রী প্রবাসীদের কল্যাণে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তন এবং জনশক্তি খাতের সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
মতবিনিময় সভায় প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে ৯টি দাবি উপস্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীদের হয়রানি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, সরকারি অর্থায়নে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা, প্রবাসে ও দেশে অবস্থানকালীন প্রবাসীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রেমিট্যান্স প্রেরণে প্রণোদনার হার বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া নিউইয়র্ক-ঢাকা রুটে পুনরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সরাসরি ফ্লাইট চালু এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রক্রিয়া আরও সহজতর করার দাবি জানানো হয়।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রবাসীদের এসব দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে বলেন, বর্তমান সরকার প্রবাসীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। তিনি ঘোষণা দেন যে, প্রবাসীদের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল ও চব্বিশ ঘণ্টা সচল হটলাইন চালু করা হবে। এই সেলের কার্যক্রম তদারকি করবেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, যার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হবে।
জনশক্তি রপ্তানি খাতে বিরাজমান অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ে মন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যে সকল অসাধু চক্র সাধারণ কর্মীদের জিম্মি করে অর্থ আত্মসাৎ করছে বা প্রবাসীদের সর্বস্বান্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি প্রবাসীদের আশ্বস্ত করেন।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে মন্ত্রী সবাইকে দেশ গড়ার কাজে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতা ভুলে একটি সম্প্রীতিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস একান্ত প্রয়োজন। প্রবাসীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু হলে তারা বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাবেন এবং এটি তাদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ সোসাইটির নেতৃবৃন্দের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সামাজিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত বক্তারা প্রবাসীদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগকৃত সম্পদ সুরক্ষায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আইনি সেল গঠনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিউইয়র্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই সরাসরি মতবিনিময় প্রবাসীদের আস্থার সংকট দূর করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে সরকারি খরচে মরদেহ পরিবহন এবং সিন্ডিকেট দমনের মতো পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে তা বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে নিউইয়র্ক-ঢাকা সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু করা গেলে তা কেবল প্রবাসীদের ভ্রমণ সহজ করবে না, বরং দেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী পরিবহনের আয় বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখবে।