বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শান্তি রক্ষা ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বিষয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, টেকসই উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের রাজনৈতিক, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিভাগের সহকারী মহাসচিব খালেদ খিয়ারির সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কার, জনসেবার মানোন্নয়ন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।
বৈঠকের শুরুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শাসনতান্ত্রিক অগ্রাধিকারসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমান সরকার জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, জনসেবার মানোন্নয়ন এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণই সরকারের মূল লক্ষ্য।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার লক্ষে গৃহীত সরকারি পদক্ষেপসমূহ ব্যাখ্যা করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘ফার্মার্স কার্ড’ এর মতো উদ্ভাবনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই উদ্যোগগুলো সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এসব কর্মসূচি তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে তিনি সহকারী মহাসচিবকে অবহিত করেন।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করেন। বর্তমানে জাতিসংঘে চলমান তারল্য সংকটের প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে শান্তিরক্ষা মিশনের ম্যান্ডেটগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করা অপরিহার্য। এছাড়া সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ও শান্তি বিনির্মাণ কার্যক্রমে নারী ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং যুবশক্তির অন্তর্ভুক্তি ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর যে আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা তুলে ধরেন তিনি। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য তিনি জোরালো আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব খালেদ খিয়ারি শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের পেশাদারিত্ব এবং নিরবচ্ছিন্ন অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকার কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেন। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ আগামী দিনগুলোতে আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান গভীর সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়ক হবে।