বাংলাদেশের প্রবাসী নাগরিকদের বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিত করতে আগামী দুই মাসের মধ্যে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের সফলতার পর প্রবাসীদের জন্য এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। রোববার (১০ মে) যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই নতুন কার্ড চালুর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কার্ডের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করা এবং তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা। মূলত বৈধভাবে রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসীরা এই কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা লাভ করবেন। বর্তমানে প্রবাসীদের জন্য ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার ইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) কার্ড প্রচলিত থাকলেও নতুন এই কার্ডটিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও সমন্বিত নাগরিক সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিএমইটি কার্ডের সাথে প্রবাসী কার্ডের পার্থক্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত বিএমইটি কার্ডটি মূলত জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অধীনে নিবন্ধিত কর্মীদের তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে। বিদেশে যাওয়ার প্রাক্কালে প্রতিটি কর্মীর তথ্য সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা এবং কোনো বিপদে পড়লে তাদের দ্রুত শনাক্ত করে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এই কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে নতুন ‘প্রবাসী কার্ড’ শুধুমাত্র একটি তথ্য সম্বলিত কার্ড হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর সাথে ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকবে।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিএমইটি কার্ডের বিদ্যমান তথ্যের পাশাপাশি প্রবাসী কার্ডে অতিরিক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হচ্ছে। এই কার্ডধারী প্রবাসীরা ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন, যা সরাসরি তাদের রেমিট্যান্স প্রবাহের সাথে সংযুক্ত থাকবে। এর ফলে প্রবাসীরা কেবল পরিচয়পত্র হিসেবেই নয়, বরং একটি ডিজিটাল আর্থিক সরঞ্জাম হিসেবে এটি ব্যবহার করতে পারবেন।”
অভিবাসন খাতের সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু সতর্কবার্তাও প্রদান করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আগে বিএমইটি কার্ড চালু করা হলেও মাঠ পর্যায়ে প্রবাসীরা এর থেকে খুব বেশি দৃশ্যমান বা দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা ভোগ করতে পারেননি। সে কারণে নতুন এই কার্ডটি যেন কেবল নামমাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রবাসীদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করে, সেদিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের সুবিধা, শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির কোটা বৃদ্ধি, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ও শিক্ষা সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণের মতো বিষয়গুলো এই কার্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক কর্মীর একটি বড় অংশ এখনো হুন্ডির মতো অবৈধ পথে অর্থ পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এতে দেশ যেমন বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা হারায়, তেমনি প্রবাসীরাও অনেক সময় প্রতারণার শিকার হন। সরকার আশা করছে, প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ ইনসেনটিভ বা সুবিধা প্রদান করা হলে অবৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা হ্রাস পাবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে এই কার্ডের কারিগরি দিক ও সুবিধাগুলোর পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা চূড়ান্ত করে তা বিতরণের কাজ শুরু হতে পারে বলে মন্ত্রণালয় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।