অর্থনীতি প্রতিবেদক
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ সাশ্রয়ী মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), এলপিজিসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য আমদানির নতুন সুযোগ লাভ করবে। একইসঙ্গে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে দেশটির জ্বালানি বিভাগে (ডিওই) আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই সময় ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মার্কিন জ্বালানি বিভাগের নীতি-নির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তির ধারা অনুযায়ী, উভয় দেশ তেল, গ্যাস, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) জ্বালানি এবং জৈব জ্বালানি খাতে নিবিড়ভাবে কাজ করবে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের কারিগরি জ্ঞান আদান-প্রদান, সংশ্লিষ্ট জনশক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যৌথ গবেষণার ক্ষেত্রে দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা প্রদান করবে। ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্যানুসারে, এই সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করবে। এটি মূলত সাশ্রয়ী মূল্য ও টেকসই সরবরাহব্যবস্থার ভিত্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে একটি শক্তিশালী কাঠামোর যোগান দেবে।
সমঝোতা স্মারক সই পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, এই চুক্তি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে। তিনি এই প্রক্রিয়ায় সমর্থনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের এই কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত সময়োপযোগী। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি উৎপাদনকারী দেশ। তাদের সাথে সরাসরি আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশ স্পট মার্কেট বা খোলা বাজারের উচ্চমূল্যের ঝুঁকি থেকে আংশিক মুক্তি পেতে পারে। এছাড়া জৈব জ্বালানি ও ভূ-তাপীয় জ্বালানির মতো অপ্রচলিত খাতের উন্নয়নে মার্কিন প্রযুক্তি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানি খাতের সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ও বাণিজ্যিক শর্তাবলি চূড়ান্ত করতে দুই দেশের কারিগরি কমিটি কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।