নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখতে এবং ‘জুলাই সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। এই ঐতিহাসিক সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর অবকাশ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের মর্যাদা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
মঙ্গলবার (১২ মে) থাইল্যান্ডের ব্যাংককস্থ ভেজথানি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত জুলাইযোদ্ধাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে গিয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রতিটি আহত যোদ্ধার শয্যাপাশে যান এবং তাদের চিকিৎসার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করেন।
আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে আহতদের দেখভাল করছে। শুধু থাইল্যান্ড নয়, বরং রাশিয়া, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কেও উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো আহতদের যাবতীয় ব্যয়ভার সরকার বহন করছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং আহতদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই অধিদপ্তরের মূল কাজ হচ্ছে শহীদ ও আহতদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, গেজেট প্রকাশ এবং শহীদ পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত তালিকা অনুযায়ী জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৬৯ জন এবং শহীদ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ৮৪৪ জনকে। এই তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে যাতে কোনো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বাদ না পড়েন।
শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য ঘোষিত আর্থিক সহায়তার কাঠামো ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শহীদ পরিবারকে এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। আহতদের ক্ষেত্রে জখমের গুরুত্ব বিবেচনা করে তিন স্তরে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুতর আহতদের ৫ লাখ টাকা, মাঝারি স্তরের জন্য ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ আহতদের ১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের জন্য মাসিক ২০ হাজার, ১৫ হাজার ও ১০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে তথ্য দিয়ে আহমেদ আযম খান উল্লেখ করেন, দেশে চিকিৎসায় জটিলতা প্রতীয়মান হওয়ায় এ পর্যন্ত ১৫২ জন আহত জুলাইযোদ্ধাকে রাশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯২ জন ইতিমধ্যে সফল চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন এবং বর্তমানে ৬০ জন বিভিন্ন দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিদেশে চিকিৎসাধীনদের সার্বিক অগ্রগতি মন্ত্রণালয় নিয়মিত তদারকি করছে।
আহতদের দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থানের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, কেবল চিকিৎসা নয়, বরং তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রাপ্ত ৩ হাজার ৪২৫টি আবেদনের মধ্য থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ৯৩৭ জন জুলাইযোদ্ধাকে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। খুব দ্রুতই এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের এই পদক্ষেপগুলো জাতীয় সংহতি রক্ষা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে তালিকার নির্ভুলতা বজায় রাখা এবং ভাতা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে এই অধিদপ্তরের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী তার সফর শেষে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং তাদের পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।