আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও তেহরানের প্রতি নিজেদের কঠোর নীতিতে অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের মাঝেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথ বন্ধ করাই তার প্রশাসনের একমাত্র অগ্রাধিকার।
গতকাল রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাওয়ার উদ্দেশ্যে হোয়াইট হাউস ত্যাগের প্রাক্কালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হন।
সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেশটির সাধারণ জনগণের মধ্যে এ নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একজন সংবাদকর্মী প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করেন যে, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে ইরানের সঙ্গে কোনো নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা তার আছে কি না। জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোজাসুজি ‘না’ সূচক উত্তর দেন।
প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের বিষয়ে কথা বলার সময় তার কাছে কেবলমাত্র একটি বিষয়ই প্রধান্য পায় এবং তা হলো—ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই লক্ষ্য অর্জনে তার প্রশাসন যেকোনো ধরণের অর্থনৈতিক বা কৌশলগত চাপ অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর।
পরবর্তীতে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়া বাড়তি চাপ সম্পর্কে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প দাবি করেন, আমেরিকান নাগরিকরা জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব বোঝেন। তার মতে, একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান পুরো বিশ্বের জন্য যে হুমকি তৈরি করবে, তার তুলনায় বর্তমান অর্থনৈতিক চাপকে গৌণ হিসেবে বিবেচনা করছেন দেশটির অধিকাংশ মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অনমনীয় মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি এর পাল্টা প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগর এলাকায় অস্থিরতার কারণে জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারগুলোতেও মুদ্রাস্ফীতির পারদ ঊর্ধ্বমুখী।
মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের ফলে নিকট ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ল বলে মনে করা হচ্ছে। চীন সফরের আগে ট্রাম্পের এই মন্তব্য বেইজিংয়ের সঙ্গে তার আসন্ন আলোচনার টেবিলেও প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ চীন ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলো এই পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অবস্থানে অনড় রয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, চীনের মধ্যস্থতায় বা আন্তর্জাতিক চাপে এই উত্তেজনার কোনো প্রশমন ঘটে কি না, নাকি বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ধাবিত হয়।