জাতীয় ডেস্ক
আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মশাবাহিত রোগের সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে ‘সুরে সুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রচারণা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার নগর ভবন সংলগ্ন ডিসিসি মার্কেটের সামনে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় আগামী ২০ দিনব্যাপী উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৫৪টি ওয়ার্ডের মোট ১০০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সচেতনতামূলক বাউল সংগীত পরিবেশন করা হবে। লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বাউল গানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য। গানের মাধ্যমে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা, পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ, ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়ে নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রচলিত প্রচার পদ্ধতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সচেতনতার বার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতেই এই লোকজ সংগীতভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ বাসাবাড়ি, আঙিনা ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন, তবে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও জানান, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চললেও ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ‘শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ডিএনসিসি ধারাবাহিকভাবে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে। বাউল গানের এই আসরগুলো জনবহুল স্থানে আয়োজনের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণির নাগরিকের কাছে স্বাস্থ্যবিধির বার্তা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কেবল সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাগরিকদের নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নাগরিকরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেবেন, তখনই ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থা টেকসই রূপ পাবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করার এই পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্ষার শুরুতে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বৃদ্ধি পায়, যা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নগরবাসীকে তাদের বাড়ির ছাদ, ফুলের টব বা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী এবং ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরীসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উদ্বোধনী পর্ব শেষে বাউল শিল্পীরা মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক গীতিনাট্য ও গান পরিবেশন করেন, যা উপস্থিত পথচারী ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, ঘনবসতিপূর্ণ শহর এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের সৃজনশীল প্রচারণা সাধারণ মানুষকে এডিস মশার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাস পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ডিএনসিসির এই ২০ দিনব্যাপী কর্মসূচিটি আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে পরিচালিত হবে।