সারাদেশ ডেস্ক
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। শনিবার দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতা এ সময় চোর সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত একটি পিকআপ ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করে। নিহতদের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে একটি পিকআপ ভ্যানে করে অজ্ঞাতপরিচয় ৩-৪ জনের একটি দল বাগচালা এলাকায় প্রবেশ করে। দলটি ওই এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকের বাড়ির গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালালে বাড়ির মালিক বিষয়টি টের পান। চোর আসার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চিৎকার শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন।
এলাকাবাসীর উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজনরা দ্রুত পিকআপ ভ্যানে করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে উত্তেজিত জনতা চারদিক থেকে তাদের ঘেরাও করে ফেলেন। একপর্যায়ে তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হলেও বাকিরা কৌশলে পালিয়ে যান। আটকের পর উত্তেজিত জনতা ওই তিন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেয় এবং তাদের বহনকারী পিকআপ ভ্যানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয়দের দাবি, তল্লাশির সময় ওই পিকআপ ভ্যান থেকে তালা কাটার বড় কাঁচি, চাপাতি ও বেশ কিছু দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
খবর পেয়ে কালিয়াকৈর থানা পুলিশ এবং ফুলবাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করে দ্রুত গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বর্তমানে ওই হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে কালিয়াকৈর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় গরু চুরির উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। একাধিকবার কৃষকের শেষ সম্বল গরু চুরির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এর আগেও চোর চক্রের সদস্যরা কয়েক দফায় গবাদিপশু নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় এলাকাবাসী রাত জেগে পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাম্প্রতিক এই নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চুরির মতো অপরাধ দমনে পুলিশের টহল ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রুখতে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। গরু চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জনরোষ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।