বিশেষ প্রতিবেদক
ভারতের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা ও তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) প্রধান চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়, যিনি থালাপতি বিজয় হিসেবে পরিচিত, তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। রবিবার (১০ মে) চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকার তাকে পদ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ করান। এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তামিলনাড়ুর দীর্ঘ ছয় দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো, যেখানে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের প্রথাগত আধিপত্যের বাইরে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তি প্রথমবারের মতো ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হলো।
৫১ বছর বয়সী বিজয়ের এই ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ আমন্ত্রণে সেখানে উপস্থিত হন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং নবনির্বাচিত বিধায়করা এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হন। বিজয়ের নেতৃত্বাধীন দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’ সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। রাজ্যের মোট ২৩৪টি আসনের মধ্যে টিভিকে এককভাবে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের লক্ষ্যমাত্রা বা ‘ম্যাজিক ফিগার’ অর্জনে তার দল সামান্য পিছিয়ে থাকায় গত কয়েক দিন ধরে রাজ্যে তীব্র রাজনৈতিক সমীকরণ ও জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গত ৬০ বছর ধরে চলে আসা দ্রাবিড় রাজনীতির দুই প্রধান শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে জনসমর্থন আদায় করা একটি অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। বিজয়কে সরকার গঠনের বৈধতা নিশ্চিত করতে গত পাঁচ দিন ধরে দফায় দফায় নীতি নির্ধারণী বৈঠক ও সমঝোতা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে। এই সময়ে তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় রাজ্যপালের সঙ্গেও চার দফা আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। শেষ পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর সমর্থনে তিনি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন প্রদান করেছে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (৫ জন বিধায়ক), বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচ্চি (২ জন বিধায়ক), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (২ জন বিধায়ক), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদী (২ জন বিধায়ক) এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) ২ জন বিধায়ক। এই দলগুলোর মোট ১২ জন বিধায়কের সমর্থনে বিজয়ের জোটের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০-এ। এর ফলে স্থিতিশীল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি ও সংখ্যাতাত্ত্বিক বাধা দূর হয়। উল্লেখ্য যে, বিজয় নির্বাচনে দুটি পৃথক আসন থেকে জয়ী হওয়ায় আইনি নিয়ম অনুযায়ী তাকে একটি আসন ছেড়ে দিতে হবে। তবে এতে জোটের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন রাজ্যটির প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজয় তার নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন উপহার দেওয়ার পাশাপাশি দ্রাবিড় জাতীয়তাবাদের মূল স্তম্ভগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে সর্বজনীন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে দুটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে আবদ্ধ থাকা রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজ এই নতুন নেতৃত্বের কাছে বিকল্প ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা করছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা কতটুকু কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
পেশাদার অভিনেতা থেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিক হয়ে ওঠার এই যাত্রায় বিজয়কে নানাবিধ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নীতিগত সমন্বয় বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনয়ন করা। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ও শিল্পোন্নত রাজ্য হিসেবে তামিলনাড়ুর শিল্পায়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বিজয়ের সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আন্তঃরাজ্য পানি বণ্টন ইস্যু সমাধানে নতুন সরকার কী ধরনের কৌশল অবলম্বন করে, সেদিকেই এখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ও দপ্তর বণ্টন চূড়ান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।