ক্রীড়া প্রতিবেদক
আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে ইরান ও আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়ার বিপরীতে ইরান ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআর) বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলোর কাছে সাতটি সুনির্দিষ্ট শর্ত পেশ করেছে। ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ এই দাবিগুলো পূরণ না হলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরান বিশ্বকাপে অংশ নিতে আগ্রহী। তবে এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। শর্তগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো—খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদান নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরে (আইআরজিসি) সামরিক সেবা দেওয়া ফুটবলারদের ভিসা জটিলতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে ইরান। উল্লেখ্য, বর্তমান দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মেহদি তারেমি ও এহসান হাজসাফি একসময় আইআরজিসিতে যুক্ত ছিলেন, যা নিয়ে আয়োজক দেশগুলোর আইনি কড়াকড়ি রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে—বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় ইরানি প্রতিনিধি দলকে জিজ্ঞাসাবাদ না করা, ইরানি সাংবাদিক ও সমর্থকদের ভিসা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া স্টেডিয়ামে ইরানের সরকারি পতাকা ব্যবহার এবং জাতীয় সংগীত অবিকৃত অবস্থায় বাজানোর নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। শেষ শর্ত হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে কেবল ফুটবল সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত আলোচনার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে কোনো রাজনৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়।
এই সংকটের মূলে রয়েছে সম্প্রতি কানাডায় মেহদি তাজের প্রবেশাধিকার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক। ভ্যাংকুভারে ফিফার সাধারণ পরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে কানাডীয় সীমান্তে বাধার মুখে পড়েন তিনি। আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিমানের মধ্যেই তার ভিসা বাতিল করে দেয় কানাডা সরকার। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে আইআরজিসি নিষিদ্ধ সংগঠন হওয়ায় এই প্রশাসনিক জটিলতা বিশ্বকাপে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ফিফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংস্থার মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রম ইতিমধ্যে কানাডার ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ইরানকে ২০ মে জুরিখে আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের স্বাগত জানানো হলেও আইআরজিসির সঙ্গে সরাসরি প্রমাণিত সম্পর্ক থাকলে আইনি জটিলতা নিরসন আবশ্যক হবে।
মাঠের লড়াইয়ে ইরান ইতিমধ্যে তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। গত মার্চে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ড্রয়ের মাধ্যমে তারা সপ্তমবারের মতো বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে। ফিফার সূচি অনুযায়ী, গ্রুপ ‘জি’-তে ইরানের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসর। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈশ্বিক ফুটবলের এই দ্বৈরথ নিরসনে এখন বিশ্ববাসীর নজর ফিফার আসন্ন বৈঠক ও জুরিখের সিদ্ধান্তের দিকে। ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই আসরে ইরান শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে মাঠে নামে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।