আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত ও তীব্র বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও অন্তত ৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার (৯ মে) দক্ষিণ লেবাননের একাধিক জনপদে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) অভিযানের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটিতে মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
লেবাননের সরকারি সূত্র ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, শনিবার দিনভর দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন কৌশলগত ও আবাসিক এলাকায় দফায় দফায় বোমাবর্ষণ করে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। বিশেষ করে সাকসাকিয়েহ নামক একটি জনপদে চালানো হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া নাবাতিয়ে অঞ্চলে একটি মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে তিন দফা ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে একজন সিরীয় নাগরিক নিহত হন এবং তার ১২ বছর বয়সী কন্যা গুরুতর জখম হয়। স্থানীয় হাসপাতালগুলো ক্রমবর্ধমান আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
লেবানন সরকারের সংকলিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে দেশটিতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নারী ও শিশুসহ ১২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৭৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। হতাহতের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়তে থাকায় এই সংঘাতকে গত কয়েক দশকের মধ্যে লেবাননের জন্য অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের নিয়মিত বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, এই অভিযানগুলো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নয়, বরং সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ও সক্ষমতা ধ্বংস করার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। আইডিএফ-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্র গুদামগুলো লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তবে লেবাননের পক্ষ থেকে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর সিংহভাগই সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন। ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু ও বসতি লক্ষ্য করে ড্রোন এবং রকেট নিক্ষেপ করেছে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির রূপরেখা ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত বরাবর প্রায় ১০ কিলোমিটার ভূখণ্ড ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তসংলগ্ন অনেক গ্রাম ও শহর ব্যাপক বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজা উপত্যকায় ধ্বংসযজ্ঞের যে চিত্র দেখা গিয়েছিল, দক্ষিণ লেবাননের অনেক এলাকায় এখন প্রায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক স্থাপনা ও নাগরিকদের ওপর এই ধরণের নির্বিচার হামলার সমালোচনা করে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান এই অস্থিরতা লেবাননের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাজধানী বৈরুতসহ উত্তরাঞ্চলের দিকে পাড়ি দিচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন লেবাননের জন্য এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বারবার সংযম প্রদর্শন ও স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানানো হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।