আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত রাশিয়ায় স্থানান্তর ও সেখানে তা সংরক্ষণের বিষয়ে মস্কো প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী মস্কোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি পারমাণবিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে রাশিয়ার এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। পুতিনের এই প্রস্তাবকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক অচলাবস্থা নিরসনে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সংবাদ সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিন উল্লেখ করেন যে, ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৫ সালে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ) বা ইরান পারমাণবিক চুক্তির আওতায় রাশিয়া ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণ করেছিল। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমরা সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে এবং প্রয়োজনে আবারও ইউরেনিয়াম মজুত স্থানান্তরের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থা অর্জনে এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন আলোচনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, অতীতে সংঘাতসংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ইরানের বাইরে ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়ে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। তবে পরবর্তীতে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও কূটনৈতিক জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন চেয়েছিল ইউরেনিয়ামের এই মজুত শুধুমাত্র মার্কিন ভূখণ্ডেই স্থানান্তর করা হোক। যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা দাবির মুখে ইরানও তাদের অবস্থান কঠোর করে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে পুতিন জানান, রাশিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান—উভয় পক্ষের সাথেই নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। মস্কোর লক্ষ্য হলো একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ সমাধানের পথ বের করা, যেখানে কোনো পক্ষের সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না। রুশ প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন যে, এই সংকট যত দ্রুত সম্ভব আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন, ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়টি সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাসে বড় ভূমিকা পালন করবে।
উল্লেখ্য, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের এই কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণার উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রাকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে এককভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও চুক্তির বেশ কিছু শর্ত থেকে সরে এসে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বৃদ্ধি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিনের এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদি ইরান তাদের মজুত রাশিয়ায় পাঠাতে সম্মত হয়, তবে তা ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ সুগম করতে পারে। তবে রাশিয়ার এই প্রস্তাবে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কূটনৈতিক মহল এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। একই সাথে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাবকে কতটা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি।
পরিশেষে, রাশিয়ার এই মধ্যস্থতার প্রস্তাবকে বিশ্ব রাজনীতিতে মস্কোর প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন সংকটের কারণে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে রাশিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই প্রস্তাবটি বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।