আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত না করলে ইউরোপীয় কাঠামো অপূর্ণ থেকে যাবে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এই মহাদেশটি দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। গত শনিবার ‘ইউরোপ দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তুর্কি প্রেসিডেন্টের মতে, সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংহতি ও ভবিষ্যতের জন্য তুরস্কের সদস্যপদ অপরিহার্য।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘শ্যুমান ঘোষণা’ কেবল একটি জোট গঠনের প্রতীক নয়, বরং এটি মহাদেশটিতে শান্তি, দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল নীতিগুলো এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে ইউরোপের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তুরস্কের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।
তুরস্ক দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে দ্রুত পরিবর্তন আসছে, তা ইইউকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ নীতি অনুসরণে বাধ্য করছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রার্থী দেশ হিসেবে তুরস্ক কেবল একটি সহযোগী রাষ্ট্র নয়, বরং ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য একটি অনস্বীকার্য অংশ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আঙ্কারা পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি এবং পূর্ণ সদস্যপদ লাভের লক্ষ্য বজায় রেখে সমতার ভিত্তিতে এই জোটের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে তুরস্ক যেমন আন্তরিক সদিচ্ছা দেখাচ্ছে, ব্রাসেলসের কাছ থেকেও সমপরিমাণ আন্তরিকতা প্রত্যাশা করে আঙ্কারা।
ইউরোপীয় জোটের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে এরদোয়ান আরও দাবি করেন, তুরস্কের যতটুকু ইইউকে প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি তুরস্ককে প্রয়োজন ইউরোপীয় ইউনিয়নের। বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অভিবাসন সংকট নিরসন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো কৌশলগত বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মেরুকরণ যত বাড়বে, ইউরোপের জন্য তুরস্কের প্রয়োজনীয়তা তত বৃদ্ধি পাবে।
উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের ৯ মে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শ্যুমান ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের পথ প্রশস্ত করে। প্রতি বছর এই দিনটিকে ‘ইউরোপ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এই বার্তা এমন এক সময়ে এল যখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠছে। তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পুনরায় ইউরোপীয় নেতাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করতে হলে তুরস্কের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সদস্যপদ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। বার্তায় এরদোয়ান ইউরোপের জনগণ এবং তুরস্কের নাগরিকদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।