সারাদেশ ডেস্ক
গাজীপুরের কালীগঞ্জে চলন্ত অটোরিকশার ওপর বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ে শারমিন ফেরদৌস (৪৭) নামে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে টঙ্গী-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের শিমুলিয়া রেলগেট সংলগ্ন এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় অটোরিকশাচালকসহ আরও দুইজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে পাশের একটি পুকুরের বিপুল পরিমাণ মাছ মারা গেছে।
নিহত শারমিন ফেরদৌস কালীগঞ্জ উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী। তিনি স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শিমুলিয়া এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশন থেকে সরবরাহকৃত লাইনের অন্তত ১৭টি খুঁটি হঠাৎ করে পর্যায়ক্রমে সড়কের ওপর ভেঙে পড়তে থাকে। এসময় একটি খুঁটি সরাসরি চলন্ত অটোরিকশার ওপর আছড়ে পড়লে যানটি দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই শিক্ষিকা শারমিন ফেরদৌস প্রাণ হারান। খুঁটিগুলো পড়ার সময় সচল বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে পাশের একটি পুকুরে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে পুকুরের মাছ মরে ভেসে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা দ্রুত বিদ্যুৎ অফিসে খবর দিলে কর্তৃপক্ষ ওই এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস অটোরিকশা থেকে নিহতের মরদেহ এবং আহতদের উদ্ধার করে।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আহত দুই ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. জাবের কায়সার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলে ঘটনাস্থলেই ওই নারী প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর টঙ্গী-কালীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের ওপর বিশালকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তারের স্তূপ পড়ে থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগের টেকনিশিয়ানরা যৌথভাবে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ৯টার দিকে খুঁটিগুলো সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে যানবাহন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জননিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখে উদ্ধার কাজ চালানো হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে এতগুলো খুঁটি একসাথে উপড়ে পড়ল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সম্প্রতি স্থাপিত এই খুঁটিগুলো স্থাপনের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যথাযথ মান বজায় রাখেনি। মাটির নিচে পর্যাপ্ত গভীরতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত না করেই তড়িঘড়ি করে লাইন টানা হয়েছিল। খুঁটিগুলোর গোড়া দুর্বল থাকায় কোনো বড় ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াই সেগুলো হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়েছে।
কালীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের কর্মকর্তা আক্তার হোসেন জানান, শিমুলিয়া সাব-স্টেশনের এই লাইনের কাজ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেন যে, একসাথে এতগুলো খুঁটি পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয় এবং এর পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণগত ত্রুটি বা গাফিলতি থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তে কারও অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ ও নিহতের সহকর্মীরা।