আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া। ২০২৬ সালের জুন মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কার্যকর থাকবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ঢাকা, শিকাগো, সাংহাই, সিঙ্গাপুর এবং মালের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতে সরাসরি যাতায়াতকারী যাত্রীরা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে যাচ্ছেন। এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেটওয়ার্ক স্থিতিশীল রাখা এবং পরিচালনা ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যেই এই সাময়িক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিমান সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, মূলত দুটি প্রধান কারণে এই কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথমত, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে নির্দিষ্ট কিছু আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় দীর্ঘপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনার দূরত্ব ও সময় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জ্বালানি খরচ ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে বিমান জ্বালানির (এটিএফ) লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সংস্থাটিকে আর্থিক চাপের মুখে ফেলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্তের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে আগেভাগেই এই রদবদল করা হয়েছে।
এই সূচি পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের রুটগুলোতে। দিল্লি থেকে শিকাগো রুটের ফ্লাইটটি সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া দিল্লি থেকে সান ফ্রান্সিসকো, টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার রুটে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের সংখ্যা আগের তুলনায় কমিয়ে আনা হয়েছে। মুম্বাই থেকে নিউইয়র্ক এবং দিল্লি থেকে নেটওয়ার্ক সেবাটিও আপাতত স্থগিত থাকছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্যারিস, রোম, জুরিখ ও ভিয়েনার মতো শহরগুলোতে ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বা সংখ্যা কমানো হয়েছে। এমনকি ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি রুটেও দৈনিক ফ্লাইটের পরিবর্তে সপ্তাহে মাত্র চারটি করে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের রুটেও বড় ধরনের কাটছাঁট করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। ঢাকা-মুম্বাই রুটে সরাসরি যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সাথে দিল্লি-সাংহাই এবং দিল্লি-মালে রুটটিও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত রুট চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুরে বিমান চলাচল আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও কাঠমান্ডুর মতো জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে ফ্লাইট একেবারে বন্ধ না করে সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে, ফ্লাইট বাতিলের বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ালে কর্তৃপক্ষ একটি স্পষ্টীকরণ বিবৃতি প্রদান করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে জ্বালানি সংকটের কারণে সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার যে তথ্য প্রচারিত হয়েছিল, তাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, এই সীমাবদ্ধতার মাঝেও তারা প্রতি মাসে অন্তত ১,২০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রাখবে।
ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বিষয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। যেসব যাত্রীদের পূর্বনির্ধারিত বুকিং এই পরিবর্তনের কবলে পড়েছে, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিকল্প ফ্লাইটে আসন পাবেন। এছাড়া যাত্রীরা চাইলে কোনো বাড়তি খরচ ছাড়াই যাত্রার তারিখ পরিবর্তন করতে পারবেন অথবা টিকিটের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরতের (রিফান্ড) আবেদন করতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতেই এই কৌশলগত পিছুহটা বলে মনে করছেন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার আকাশপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক ও সাধারণ যাত্রীরা সাময়িক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।