আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। আজ সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিট) রাজ্যজুড়ে স্থাপিত ৭৭টি কেন্দ্রে একযোগে এই গণনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বিধানসভার এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে আগামী পাঁচ বছর পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১২টি আসনের ফলাফল বা প্রবণতা সামনে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। প্রাথমিক তথ্যে ১১২টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৫৬টিতে এবং তৃণমূল কংগ্রেস ৫৩টিতে এগিয়ে রয়েছে। এছাড়া জাতীয় কংগ্রেস ২টিতে এবং অন্যান্য প্রার্থীরা ১টি আসনে এগিয়ে আছেন। তবে রাজ্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বামফ্রন্ট (সিপিএম) এখন পর্যন্ত কোনো আসনে জয়ের দেখা পায়নি বা উল্লেখ্যযোগ্য কোনো অগ্রগামিতা দেখাতে পারেনি।
এর আগে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় এবার গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা বিগত নির্বাচনের তুলনায় কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। গত নির্বাচনে যেখানে ১০৮টি গণনাকেন্দ্র ছিল, এবার তা কমিয়ে ৭৭টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। রাজধানী কলকাতার ১১টি আসনের মধ্যে ৭টি আসনের ভোট গণনার জন্য ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রকে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শহরের বৃহত্তম গণনাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ভোট গণনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা গেছে, প্রথমে পোস্টাল ব্যালটগুলো গণনা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) জমা পড়া ভোটগুলো গণনা করা হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দুপুর নাগাদ জয়-পরাজয়ের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করতে রাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রতিটি গণনাকেন্দ্রকে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত কাউন্টিং এজেন্টদের জন্য কিউআর কোড সংবলিত বিশেষ পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রগুলোতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে; কেবল দায়িত্বরত নির্বাচন কর্মকর্তারা বিশেষ প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভবানীপুর আসনটি। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। এই আসনের ফলাফলের ওপর পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এছাড়াও বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল প্রার্থীর ওপর বিশেষ নজর রয়েছে সাধারণ মানুষের। তৃণমূল কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতা বন্দরের ফিরহাদ হাকিম, রাসবিহারীর দেবাশীষ কুমার এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার বাগদা আসনের মধুপর্ণা ঠাকুর। অন্যদিকে বিজেপির হয়ে লড়াই করছেন রুদ্রনীল ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল এবং অর্জুন সিংয়ের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা। বাম ও কংগ্রেস জোটের হয়ে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় এবং অধীর চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ নেতাদের লড়াইয়ের ফলাফলও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। পাশাপাশি ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) নওশাদ সিদ্দিকীর পারফরম্যান্স রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আজ দিনভর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার চূড়ান্ত অবসান ঘটবে আজকের এই ভোট গণনার মধ্য দিয়ে। শেষ পর্যন্ত কলকাতার মসনদে কার অভিষেক ঘটে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।