নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় সংবাদকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর পুলিশ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, পারিবারিক অভিমান ও গভীর মানসিক হতাশা থেকেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেদনে এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তির প্ররোচনা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর শেরেবাংলা নগরের সোবহানবাগ এলাকার নাভানা টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ।
তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, স্বর্ণময়ীর মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধের কারণে, যা সাধারণত ঝুলে থাকার ফলে ঘটে থাকে। এছাড়া মৃত্যুর আগে তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবে ‘ভ্যাজাইনাল সোয়াব’ পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম গত ১৪ এপ্রিল আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। পরবর্তীতে ১৯ এপ্রিল আদালত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা শেষে গ্রহণ করেন। প্রতিবেদনে স্বর্ণময়ীর ব্যক্তিগত জীবন এবং মৃত্যুর আগের ঘটনাবলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে একটি রক্তমাখা ব্লেড, ওড়না, একটি নোটবুক এবং ডায়েরি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত ডায়েরি ও চিরকুটে স্বর্ণময়ী তার জীবনের টানাপোড়েন, পরিবারের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত মানসিক কষ্টের কথা লিখে গেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, পরিবারের কাছে তিনি নিজেকে কেবল একটি ‘দায়িত্ব’ হিসেবে মনে করতেন। এই বোধ থেকেই তার মধ্যে গভীর বিষণ্নতা ও একাকীত্ব তৈরি হয়েছিল। ডায়েরির পাতায় ফুটে ওঠা তার আবেগ ও অভিমানী বার্তাগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
ঘটনার দিন স্বর্ণময়ীর আচরণের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন সকাল থেকেই তিনি কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। বিকেলে তার আত্মীয়রা বাসায় গেলে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। স্বজনরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলে তিনি দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়া না পেয়ে এবং বারবার ডাকার পরেও দরজা না খোলায়, এক পর্যায়ে স্বজনরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তাকে ফ্যানের সাথে ওড়নায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পুলিশের ভাষ্যমতে, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং উদ্ধারকৃত চিরকুটের হাতের লেখা বিশ্লেষণ করে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত হতাশা তাকে এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা না থাকায় মামলাটির আইনি পরিসমাপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্বের বিষয়টি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পুনরায় সামনে এসেছে। বিষণ্নতা এবং একাকীত্বের মতো বিষয়গুলো সঠিক সময়ে চিহ্নিত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের এই অকাল মৃত্যু সংবাদমাধ্যমের কর্মী মহলেও শোকের ছায়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে মানসিক সহায়তার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।