নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্যবাহী দুটি কনটেইনার জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় জাহাজের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকায় পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে জাহাজে থাকা প্রায় ২ হাজার ৮০০ একক (টিইইউএস) কনটেইনার সময়মতো খালাস করা নিয়ে আমদানিকারক ও বন্দর সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার (০১ মে) সকালে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ দুটিকে বন্দরের জেটিতে ভেড়ানোর প্রস্তুতিকালে এই দুর্ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ শিল্প কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে জাহাজ দুটি বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ছিল। এর মধ্যে একটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শিপিং লাইন ‘মায়ারস্ক’-এর মালিকানাধীন এবং অন্যটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত ‘এইচ আর তুরাগ’।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, জেটিতে প্রবেশের জন্য জাহাজগুলো যখন প্রস্ততি নিচ্ছিল, তখন কারিগরি ত্রুটি বা নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে জাহাজ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় জাহাজের উপরিভাগের কাঠামোতে দৃশ্যমান ক্ষতি হয়েছে। তবে পানির নিচের অংশে কোনো ছিদ্র বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পানির নিচে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে ডুবুরি দল বা বিশেষায়িত কারিগরি পরীক্ষার প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পাইলট ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুদ্দীন ঘটনার বিষয়ে জানান, জাহাজ দুটিকে জেটিতে নিয়ে আসার জন্য নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছানোর আগেই এই সংঘর্ষ ঘটে। পরবর্তীতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবং জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করে জাহাজ দুটিকে জেটিতে না এনে পুনরায় বহির্নোঙরে নিরাপদ দূরত্বে রাখা হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধান এবং ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ নিরূপণে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে জাহাজ দুটি পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া এবং জাহাজ চলাচলের ফিটনেস সনদ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ দুটির সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চলাচল স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানিকৃত পণ্যের সিংহভাগ খালাস করা হয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে কাঁচামাল নিয়ে আসা জাহাজগুলোর কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া বা ‘ডিটেনশন চার্জ’ গুণতে হতে পারে, যা সামগ্রিক ব্যবসা ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি দেখা যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামান্য, তবে দ্রুত মেরামতের পর জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন হলে পণ্যগুলো অন্য জাহাজে স্থানান্তর করার বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও চিন্তা করা হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজ দুটির সার্বিক নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।