নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসে ডাকাতি করা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে চক্রের মূল হোতা মো. আলামিন ও তার সহযোগী গাড়িচালক মো. রায়হান রয়েছেন। রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করার সময় থানা থেকে লুট হওয়া সরঞ্জাম ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি জানান, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুয়া পরিচয় দিয়ে সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সর্বস্ব লুট করে আসছিল।
র্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহাসড়কে ভুয়া পরিচয় দিয়ে ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর ডেমরার আমান মার্কেট এলাকার মেন্দিপুর থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে প্রথমে আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাজী সিএনজি পাম্প এলাকা থেকে সহযোগী রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আলামিন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের হেফাজত থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলি, থানা থেকে লুট হওয়া দুই সেট হ্যান্ডকাপ, র্যাবের ছয়টি কটি, পুলিশ লেখা স্টিকার, সেনাবাহিনীর মাস্ক, ওয়াকিটকি, লেজার লাইট ও একটি পকেট রাউটার উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস ও দুটি ভুয়া নম্বর প্লেট জব্দ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করত। তারা কখনও র্যাব, কখনও পুলিশ, আবার কখনও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানের পরিচয় দিয়ে চলন্ত গাড়ি থামাত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে চালক বা যাত্রীরা সাধারণত তাদের সন্দেহ করত না। একবার গাড়ি থামাতে সক্ষম হলে তারা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেত।
গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও অপরাধের ধরণ বিশ্লেষণ করে র্যাব জানায়, চক্রের নেতা আলামিন আগে ইট, বালু ও মুরগির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে কোনো বৈধ পেশায় না থাকলেও তিনি এই ডাকাত চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। অন্যদিকে, পেশাদার চালক রায়হান মূলত ডাকাতির জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন সরবরাহ ও তা চালানোর দায়িত্ব পালন করতেন। এছাড়া কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ডাকাতির আগে এলাকাটি পর্যবেক্ষণ (রেকি) করা এবং লুণ্ঠিত মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও তিনি করতেন।
চক্রের প্রধান আলামিনের অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে র্যাব পরিচয় দিয়ে দুই স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭১ লাখ টাকা ডাকাতির চাঞ্চল্যকর মামলার অন্যতম অভিযুক্ত। ওই বছরই তিনি র্যাবের হাতে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তবে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর পুনরায় একই ধরণের অপরাধে লিপ্ত হন। আলামিনের বিরুদ্ধে রাজধানীর খিলগাঁও, মুগদা, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, টাঙ্গাইল সদর এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ডাকাতি, চুরি ও অস্ত্র আইনে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চক্রের সাথে আরও কয়েকজন সক্রিয় সদস্য জড়িত থাকতে পারে, যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে ডাকাতিতে অংশ নেয়। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে থানা থেকে লুট হওয়া হ্যান্ডকাপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম তাদের হাতে কীভাবে পৌঁছাল, সে বিষয়ে গভীর তদন্ত শুরু হয়েছে। বাহিনীর কটি ও স্টিকারের অপব্যবহার রুখতেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাব ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ গাড়ি থামাতে বললে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার এবং সন্দেহজনক মনে হলে নিকটস্থ থানা বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আদালতে সোপর্দ করার প্রস্তুতি চলছে বলে র্যাব জানিয়েছে।