অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেড সরকারের অনুকূলে বড় অংকের অগ্রাধিকারমূলক (প্রেফারেন্স) শেয়ার ইস্যু করেছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের মোট ১৩২ কোটি ৪২ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৪টি শেয়ার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের অনুকূলে ইস্যু করা হয়েছে। গত ২২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই শেয়ার ইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও কোম্পানি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ২০২৩-২৪ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটির কাছে সরকারের পাওনা বা ‘শেয়ার মানি ডিপোজিট’-এর বিপরীতে এই শেয়ারগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মূলত সরকারের বিনিয়োগকে মূলধনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার হওয়ার কারণে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ভোটাধিকার বা লভ্যাংশের ক্ষেত্রে এটি ভিন্নতর প্রভাব রাখতে পারে। তবে এই বিশাল পরিমাণ মূলধন সমন্বয়ের ফলে কোম্পানির আর্থিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক পরিধি ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুমোদিত মূলধন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাওয়ার গ্রিডের অনুমোদিত মূলধন ১৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয় চাহিদা মেটাতে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত মূলধন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
চলতি ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে পাওয়ার গ্রিডের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ২২ পয়সা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল মাত্র ১ টাকা ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
২০০৬ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির বর্তমানে মোট শেয়ার সংখ্যা ৯১ কোটি ৩৮ লাখ ৬ হাজার ৯৯১টি। বর্তমানে কোম্পানির মালিকানা কাঠামোর সিংহভাগই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির মোট শেয়ারের ৫৮ দশমিক ৫০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। সরকারের সরাসরি মালিকানায় রয়েছে ২২ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক শূন্য ১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের অনুকূলে অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার ইস্যুর ফলে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি পাবে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদী ঋণের দায়ভার কমানোর পাশাপাশি কোম্পানির নেট সম্পদের মূল্য বা এনএভি-তেও পরিবর্তন আসতে পারে। দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাওয়ার গ্রিডের এই মূলধন পুনর্গঠন ও আয় বৃদ্ধি জাতীয় বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে অগ্রাধিকার শেয়ারের বিপরীতে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ প্রদানের শর্তগুলো ভবিষ্যতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্তিতে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে। মূলত টেকসই সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সক্ষমতা অর্জনে সরকারের এই অর্থায়নের বিপরীতে শেয়ার ইস্যু একটি নিয়মিত আর্থিক প্রক্রিয়ার অংশ।