বিশেষ প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সহপাঠীর হাতে নির্মমভাবে নিহত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সরকারের এই অবস্থান ও প্রস্তুতির কথা জানান। তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, নিহতদের পরিবার যেন দ্রুত তাদের স্বজনদের মরদেহ ফিরে পায়, সে লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৩তম দিনে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবুর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ওই দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পরপরই ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ফ্লোরিডার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সক্রিয় ভূমিকা পালন শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যাদি সম্পন্ন করতে বিশেষ তদারকি সেল গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এই বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ড. খলিলুর রহমান বলেন, প্রবাসীদের জানমালের নিরাপত্তা এবং যেকোনো দুর্যোগে তাদের পাশে দাঁড়ানো বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান দিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো যাতে প্রবাসীদের জন্য কেবল দাফতরিক সেবাকেন্দ্র না হয়ে একটি আস্থার ঠিকানা হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হটলাইন সেবা ও বিশেষ কনস্যুলার টিম কাজ করছে।
সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রী বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকবলিত এলাকায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয় প্রদান এবং তাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের জন্য কনস্যুলার সহায়তা আগের তুলনায় বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর সহিংসতা বা কোনো ধরনের নিরাপত্তাহীনতার খবর পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দূতাবাসগুলোকে স্থায়ী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও প্রবাসী সুরক্ষা আইন আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে শোক কাটিয়ে উঠতে সরকারিভাবে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে স্থানীয় মার্কিন প্রশাসনের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা হয়েছে। আইনি লড়াইয়ে পরিবারগুলোকে আইনি পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তার জন্যও কনস্যুলার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই তদারকির ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত শিক্ষার্থীদের মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রবাসীদের সুরক্ষায় সরকারের এই কঠোর ও সময়োপযোগী অবস্থান দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংসদীয় আলোচনায় অভিমত ব্যক্ত করা হয়।