নিজস্ব প্রতিবেদক
নিরাপদ পানির উৎস সুরক্ষা ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে আধুনিক পানিশোধন প্রযুক্তির প্রসার ও জলাধার সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
আজ মঙ্গলবার বিশ্ব পানি দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীর কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই সেমিনারে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার মতো মেগাসিটিগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সংস্কারের পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
নিরাপদ পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, নগরাঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষ এবং বস্তিবাসীরা এখনো নিরাপদ পানির সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এটি কেবল উন্নয়নগত সমস্যা নয়, বরং একটি মানবিক সংকটও বটে। এই বৈষম্য নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যাতে প্রতিটি নাগরিকের কাছে মানসম্মত পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান জানান, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে শতভাগ নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। তবে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল তার বক্তব্যে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পানিশোধন প্রযুক্তির আধুনিকায়নের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, লবণাক্ততা ও আর্সেনিকপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে ইউনিসেফের প্রতিনিধি স্ট্যানলি গওয়াবুয়া এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, পানি দূষণ রোধ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির গুণমান বজায় রাখতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিল্পবর্জ্য যেন নদী বা জলাশয়ে না মেশে, সে বিষয়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপের পরামর্শ দেন তারা।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনার শেষে মন্ত্রী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে আগামীতে দেশের পানি সংকটে টেকসই সমাধান আসবে।