আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপগুলো দ্বিপাক্ষিক এবং আঞ্চলিক আস্থা নষ্ট করছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ‘বৈরী আচরণ ও অপারেশনাল চাপ’ অব্যাহত থাকলে তেহরান কোনো ধরনের সংলাপে অংশ নেবে না। রবিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট তার দেশের এই কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, ফোনালাপে মাসুদ পেজেশকিয়ান চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে গাজা ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, একদিকে সংলাপের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনার পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “চাপ ও হুমকির মুখে তেহরান কখনো আলোচনায় বসবে না। আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে ইরানের বন্দরগামী জাহাজের ওপর আরোপিত অবরোধসহ বিভিন্ন ‘অপারেশনাল বাধা’ দূর করতে হবে।” তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটনের বর্তমান পদক্ষেপগুলো পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি ধ্বংস করছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক উদ্যোগের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তখন ইরানের এই অনমনীয় অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আলোচনার টেবিল এবং অবরোধ—এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলতে পারে না।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছেন। তিনি সম্প্রতি পাকিস্তান সফর শেষ করে ওমানের রাজধানী মাসকাটে পৌঁছেছেন। ইসলামাবাদে অবস্থানকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশই চলমান সংঘাত বন্ধে এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননের জনগণের অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ফোনালাপ ও বৈঠককালে আশ্বাস দিয়েছেন যে, ইসলামাবাদ আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তার আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তিনি ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দেন এবং চলমান সংকট নিরসনে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওমান দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে ইরানের সর্বশেষ অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা এখন আর কেবল মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তার পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করুক এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুক।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই উত্তেজনার সঙ্গে জড়িত। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ইসলামাবাদ সফরের পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়া এবং ওয়াশিংটনের নতুন নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ফলে তেহরান ধারণা করছে যে, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ইরান এখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে চাপ মোকাবিলার কৌশল গ্রহণ করেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্রমবর্ধমান বিরোধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদি ওয়াশিংটন তাদের অবরোধ নীতি থেকে সরে না আসে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেহরান এখন স্পষ্টভাবেই বিশ্ববাসীকে বার্তা দিচ্ছে যে, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনার টেবিলে ফিরবে না।