নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন না করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরএফ) আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের অংশ হিসেবে সংবাদকর্মীদের সাথে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়।
বাজেট পূর্ববর্তী এই আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, সংবাদমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আপনারা যদি সঠিক এবং তথ্যনির্ভর রিপোর্টিং করেন, তবে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। সরকার সবসময় গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারের অন্ধ স্তুতি বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সাংবাদিকতার আদর্শ হতে পারে না। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের কোনো নির্দিষ্ট দলের অনুসারী হয়ে সংবাদ পরিবেশন করার প্রয়োজন নেই। বরং একজন প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে সত্য তুলে ধরাই আপনাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার জন্য তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান।
আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে বাজেট প্রণয়নের মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় জনমত প্রতিফলিত করার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলো সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে নীতিনির্ধারকদের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে গঠনমূলক বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তবে সেই বিতর্ক বা সংবাদ যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। পেশাদার সাংবাদিকতা দেশের উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পাঠায়, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে তথ্য প্রাপ্তিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এর জবাবে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিক। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পেতে পারেন, যাতে করে ভুল বা আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সংবাদ প্রচার না হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায়শই গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে এবং বড় ধরনের নীতি নির্ধারণী আলোচনার সময় রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার এই আহ্বান পেশাদার সাংবাদিকদের মনোবল বৃদ্ধি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিশেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি দেশের মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই এই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার সাহস থাকতে হবে। তবে সেই সমালোচনা যেন তথ্যের ভিত্তিতে হয়, কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা গেলে গণতন্ত্র ও অর্থনীতি উভয়ই শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে, যার প্রস্তুতি হিসেবে এখন বিভিন্ন অংশীজনের সাথে ধারাবাহিক মতবিনিময় করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।