অর্থনীতি প্রতিবেদক
বিগত সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে অতিরিক্ত রাজনীতিকীকরণের ফলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বর্তমানে তীব্র মূলধন সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও মূলধন কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি জানান, অতীতে সংঘটিত অনিয়ম ও লুটপাটের প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে। বর্তমানে সরকার এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থাকে ‘আন্ডার ক্যাপিটালাইজড’ বা মূলধন ঘাটতি হিসেবে অভিহিত করে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতও এখন পুঁজির অভাবে ভুগছে। তিনি এর কারণ হিসেবে মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করেন। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, গত কয়েক বছরে স্থানীয় মুদ্রার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং প্রায় ১৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোতে সরকারি তহবিল থেকে অর্থ জোগান দিয়ে মূলধন পুনর্গঠনের সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে সরকারের তহবিলে এখন এমন পর্যাপ্ত অর্থ নেই যে ঢালাওভাবে সব ব্যাংককে পুনঃমূলধনীকরণ করা সম্ভব হবে। অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় এটি একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দেশের সম্পদ গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকার এখন সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা ও আসন্ন বাজেটের পরিকল্পনা নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় উপস্থিত ইআরএফ প্রতিনিধিরা দেশের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, গৃহীত সংস্কার উদ্যোগসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী অর্থবছর থেকেই জাতীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে।