নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দেশের বিচার বিভাগকে কলুষমুক্ত করা এবং রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে যশোর আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত এই সভায় তিনি বর্তমান সরকারের লক্ষ্য এবং দেশের সামগ্রিক বিচারিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করেন।
আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, সরকার দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি যদি পুনরায় জেঁকে বসে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বর্তমান ধারা ব্যর্থ হয়, তবে দেশ এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। এটি কেবল বর্তমান সময়ের জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্যও একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। তাই একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ধারার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
বিচার বিভাগের শুদ্ধি অভিযান ও অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিচার ব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি সাবেক বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির কারণেই দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কয়েক লক্ষ মামলাকে তিনি ‘মিথ্যা ও গায়েবি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার এমন এক বিচারিক পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে আইনজীবী ও বিচারকগণ সর্বোচ্চ নৈতিকতা ও সততার পরিচয় দেবেন।
দেশের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন যে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করেই বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো পরিচালিত হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থে কোনো প্রকার বিভক্তি কাম্য নয়।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি একটি নাজুক সময় পার করেছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র যখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন ছিল, তখনও সরকার সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে। তিনি দাবি করেন, একটি স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেশের মানুষ দেখেছে, তা বাস্তবায়নে সরকার ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে।
আইন শৃঙ্খলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি দীর্ঘ ১০ বছর পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এটিকে তিনি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করেন।
মতবিনিময় সভায় যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারা বিচারিক ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা নিরসন এবং আইনজীবীদের পেশাগত মান উন্নয়নে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জবাবে আইনমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, বিচার বিভাগে যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আইনি সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।