অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে বাংলাদেশের পথে রওনা হয়েছে বিশালাকার ট্যাংকার ‘এমটি নিনেমিয়া’। রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল) সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, জাহাজটি আগামী ৪ অথবা ৫ মে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছাবে। মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিকল্প পথ হিসেবে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর উপকূল হয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর থেকে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এর আগে সোমবার রাতে ট্যাংকারটিতে তেল বোঝাই সম্পন্ন হয়। সাধারণত ইয়ানবু বন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে একটি জাহাজের গড়ে ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত জানান, আমদানিকৃত এই তেল দেশে পৌঁছালে শোধনাগারের কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা অনেকটা দূর হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামে ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলবাহী অপর একটি জাহাজ বর্তমানে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকে আছে। জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পক্ষ থেকে বিশেষ ছাড়পত্র না পাওয়ায় বাংলাদেশে আসতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে ইয়ানবু বন্দর থেকে লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করে ‘এমটি নিনেমিয়া’র আগমনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ মেট্রিক টন। এই চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যেখানে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান আসে মাত্র ৮ শতাংশ। আমদানি করা এই তেলের একটি বড় অংশ পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল শোধন করে, যা দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে থাকে। ফলে অপরিশোধিত তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ইআরএল-এর সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
বিপিসি প্রকাশিত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মোট ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এই ব্যবহারের সিংহভাগই হচ্ছে পরিবহন খাতে, যা মোট বিক্রির ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এছাড়া কৃষিতে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। গৃহস্থালি ও অন্যান্য খাতে ব্যবহারের পরিমাণ যথাক্রমে ০ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
জ্বালানির ধরণ অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। গত অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর বাইরে ফার্নেস অয়েল ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ, জেট ফুয়েল ৮ দশমিক ০১ শতাংশ, পেট্রল ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং অকটেন ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। কেরোসিনের ব্যবহার ছিল মাত্র ০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। পরিবহন ও কৃষি খাতের ওপর এই জ্বালানি নির্ভরতার কারণে সময়মতো অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।