নিজস্ব প্রতিবেদক
বগুড়া: বিচার বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি লাঘবে বগুড়াসহ সাতটি জেলায় ‘ই-বেইলবন্ড’ (ইলেকট্রনিক জামিননামা) সিস্টেমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার সকাল ১১টায় বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই আধুনিক ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন। একই সাথে তিনি বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনও উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় না থাকলে নাগরিকরা গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ করে গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের অংশ হিসেবে ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দেশের সকল আদালতে কার্যকর করা হবে।
ই-বেইলবন্ডের কার্যকারিতা ও সুফল ই-বেইলবন্ড বা ইলেকট্রনিক জামিননামা পদ্ধতির মাধ্যমে আদালত থেকে জামিনের আদেশ সরাসরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যাবে। আগে একটি জামিননামা আদালত থেকে কারাগারে পৌঁছাতে আইনজীবী, মুহুরি ও পুলিশের নানা পরিক্রমায় প্রায় ১৩টি ধাপ অতিক্রম করতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরিকারী। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে জামিন পাওয়ার পর কারামুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে এবং জামিননামা জালিয়াতির আশঙ্কা শূন্যে নেমে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, এই সিস্টেমকে ভবিষ্যতে পুলিশের সিডিএমএস (CDMS), আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ভেরিফিকেশনের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে হয়রানি এবং এক জেলার আসামিকে অন্য জেলায় গ্রেপ্তারের পর জামিন পেতে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, তা দূর করা সম্ভব হবে।
বিচার বিভাগের সংস্কার ও স্বাধীনতা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের মুখ্য ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, আদালতকে হয়রানির পরিবর্তে ন্যায়বিচারের নিরাপদ স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিচার বিভাগ যদি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে সমাজ থেকে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। তিনি বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং বৈষম্যহীন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে সাধারণ নাগরিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনের প্রয়োগে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান ও কারা সংস্কার আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো করুণা নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।” তিনি জেলখানায় বিনা বিচারে দীর্ঘকাল আটকে থাকা বন্দিদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে যারা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারছেন না, তাদের আইনি সহায়তা প্রদানের পথ খুঁজে বের করতে তিনি উপস্থিত আইনমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বগুড়া ছাড়াও এদিন ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলায় এই ইলেকট্রনিক জামিননামা পদ্ধতি চালু করা হয়। সরকারের এই উদ্যোগকে বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।