অর্থনীতি প্রতিবেদক
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বাহ্যিক বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান নীতিমালা মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করছে। একই সাথে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী প্রভাব কমাতে কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
আজ জাতীয় সংসদে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব তথ্য প্রদান করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে মন্ত্রী দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাহ্যিক ধাক্কাগুলো যেন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য সরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নিয়মিত বাজার ও নীতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হচ্ছে। বিশেষ করে সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) সচল রাখা এবং ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রাখা হয়েছে।
সরবরাহ ব্যয় বা লজিস্টিকস খাতের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী লজিস্টিকস খরচ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খরচের হার প্রায় ১৬ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উচ্চ লজিস্টিকস খরচের কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পায়। এই ব্যয় কমিয়ে আনতে বন্দরগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। খুব শিগগিরই এসব পদক্ষেপের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে তিনি সংসদে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রপ্তানি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পণ্য বহুমুখীকরণ প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। একক খাতের ওপর এই নির্ভরতা কমিয়ে আনতে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি হ্রাস করতে সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর বাইরে নতুন নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব দেশে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক ও কর আরোপ করা আছে, সরকার সেগুলো চিহ্নিত করে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (পিটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বিষয়ক আলোচনা চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য আরও অনুকূল বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সরকার মনে করে, লজিস্টিকস ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ করা গেলে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবস্থানে পৌঁছাবে।
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে উঠে আসে যে, সরকারের প্রধান লক্ষ্য এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মধ্যস্থতা কমিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা। বিশেষ করে সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকারের এসব নীতিগত পদক্ষেপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে অধিবেশনে জানানো হয়।