আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময় পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি উন্মুক্ত থাকবে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার কমে ৮৮ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ গত শুক্রবার সকালেও এই তেলের বাজারমূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের উপরে। তেলের দাম কমার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.২ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোতেও সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। প্যারিসের ক্যাক এবং ফ্রাঙ্কফুর্টের ড্যাক্স সূচক প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। মূলত ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি এক বার্তায় উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি এখন থেকে চলাচলের জন্য প্রস্তুত এবং এটি ভবিষ্যতে আর কৌশলগত ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। তবে তিনি এও জানিয়েছেন যে, স্থায়ী কোনো চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে।
ভৌগোলিকভাবে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এছাড়া সার তৈরির কাঁচামালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে সারাবিশ্বে সরবরাহ করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই এই পথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একপর্যায়ে ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা সহজ হবে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। বেইস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মনমোহন সোধি মনে করেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর সাপ্লাই চেইন পূর্বের অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস সময় নিতে পারে। ফলে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের ওপর থেকে এখনই চাপের ভার কমবে না। ইতিমধ্যে তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও বিমান চলাচল খাতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিরাপত্তার বিষয়ে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শিপিং খাতের শীর্ষ সংস্থা বিমকো জানিয়েছে, প্রণালির নৌপথে মাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। সংস্থাটির নিরাপত্তাপ্রধান জ্যাকব লারসেন বলেন, শুধু ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে পরিস্থিতি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। একইভাবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছেন এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য শতভাগ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখছেন।
স্টেনা বাল্কের মতো বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই পথে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সার্বিকভাবে ইরানের এই ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার স্থায়ী সমাধানের ওপর।