আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ জব্দের ঘোষণা এবং তেহরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হতেই অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেকার এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বাজার সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪.৬৬ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৫.৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
উত্তেজনার সূত্রপাত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণার পর। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মার্কিন বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ আটক ও জব্দ করেছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। গত শনিবার ইরান ঘোষণা দেয়, তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে এই জলপথে প্রবেশের চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দেয় দেশটি। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের একটি বিশাল অংশ এই সরু প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এই পথ বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ইরান শর্ত দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের আলোচনায় বসবে না। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, অবরোধ বহাল রেখে আলোচনার টেবিলে বসার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে তাদের নেই। এই অনড় অবস্থানের কারণে কূটনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রতি চরম আলটিমেটাম দিয়েছেন। ইরানকে ‘শেষ সুযোগ’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেছেন যে, প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলে দেশটিকে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের পাল্টা হুমকির ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের কালো মেঘ দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাজারজাত করা হয়। এই নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। বিশেষ করে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি দ্রুত শান্ত না হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানালেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনার পারদ কেবলই বাড়ছে।