জাতীয় সংসদ ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন নোয়াখালী-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বিশেষ করে নারী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের টার্গেট করে পরিচালিত ‘অনলাইন মব’ বা সামাজিক হেনস্তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
রোববার (২০ এপ্রিল, ২০২৬) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন। অধিবেশন চলাকালে স্পিকারের আসনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ব্যারিস্টার খোকন তার বক্তব্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের সম্মানহানি ও ক্রমবর্ধমান অপব্যবহারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো জনমতের ওপর যেমন প্রভাব ফেলছে, ঠিক তেমনি এর অপব্যবহারও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছাড়াই ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা অনেকটা ‘মব’ বা গণপিটুনির মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নারীদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগীদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি মানসিকভাবে তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে সাইবার অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় আইন থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে। তাই রাষ্ট্রের উচিত নাগরিকদের সম্মান রক্ষার্থে এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর আইনানুগ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি নবনিযুক্ত ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, “আপনি একজন দক্ষ আইনজীবী এবং দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে রাজপথে ও আইনি লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবেও আপনার ভূমিকা প্রশংসনীয়। বর্তমান সংসদ একটি আইন সভা এবং আপনার মতো আইনজ্ঞের পরিচালনায় এই সংসদ আরও বেশি প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে বলে দেশবাসী আশা করে।”
এ সময় তিনি সংসদে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দের আহ্বান জানান। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, যারা সরাসরি মাঠপর্যায়ে বা আইন অঙ্গনে প্র্যাকটিশনার হিসেবে কাজ করেন, তারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরও গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করতে সক্ষম। বিশেষ করে যারা নিয়মিত উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করলে দেশ এবং জাতি উপকৃত হবে। আইন সভার গুরুত্ব ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের কথা বলার সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সংসদীয় আলোচনায় উঠে আসা এই বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত চরিত্র হননের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহের যুগে আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ব্যারিস্টার খোকনের এই দাবি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন নয়, বরং নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগেরও প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যদি সাইবার স্পেস নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তার বক্তব্যের শেষাংশে সংবিধান ও আইনের আলোকে সংসদকে একটি উচ্চস্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান। অধিবেশনের এই পর্যায়ে আইনপ্রণেতাদের অনেকেই তার বক্তব্যের প্রতি মৌন সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।