অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কৌশলগত পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদার করা। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ রাশিয়ার কাছ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সমরাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সশস্ত্র ড্রোন, ট্যাংকবিধ্বংসী গোলাবারুদসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম।
ভারত সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষের পর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত মাসে ফ্রান্স থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপগুলো ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য জ্বালানি ও কৌশলগত ঝুঁকি মোকাবিলার একটি অংশ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরোধী কৌশলগত জোট কোয়াডের সদস্য হলেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে পুনরায় ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছে, যা ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি শুল্ক আরোপের ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দূরত্বও এই প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ, যা শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই গড়ে উঠেছে। মস্কো তখন ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদার ছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো তেল ও জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। ভারতের রপ্তানি ও আমদানি নীতিতে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি ভারতের জ্বালানি কৌশলের একটি মূল স্তম্ভে পরিণত হয়, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।
ইরান-নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের পর ভারতের জন্য জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। হরমুজ প্রণালির বাধার কারণে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যাহত হয় এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে, মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে আলোচনার মাধ্যমে তেল ও এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি এবং সরাসরি সরবরাহ পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। রুশ জ্বালানি পারস্য উপসাগরের সংবেদনশীল অঞ্চলের বাইরে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়, যা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তবে ভারত এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও বজায় রাখছে, যা তার স্বার্থ ও কৌশলগত নমনীয়তা নিশ্চিত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জোটগুলোর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সংকট সৃষ্টিতে দেশগুলো তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং নির্দিষ্ট জোটের পরিবর্তে পরিস্থিতির ভিত্তিতে কৌশলগত অবস্থান সামঞ্জস্য করছে।
সংক্ষেপে, ইরান যুদ্ধ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তন। ভারত দুই শক্তিধর দেশের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার জন্য কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করছে।