স্বাস্থ্য ডেস্ক
রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ) সাম্প্রতিক সময়ে শিশু রোগীদের হামের প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণের কারণে সংকটে রয়েছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে এখানে ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই মৃত্যুর পেছনে শুধুমাত্র হাম দায়ী নয়; বরং নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং জন্মগত হৃদরোগের মতো জটিল সহ-রোগসমূহ (কো-মরবিডিটি) মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে।
হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল জানান, অধিকাংশ মৃত শিশুর বয়স ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে, যারা এখনও হামের টিকার আওতায় আসেনি। মৃত শিশুদের প্রায় সবার ক্ষেত্রে দেখা গেছে হামের সঙ্গে গুরুতর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া অথবা চোখের প্রদাহসহ বিভিন্ন জটিলতা ছিল। কিছু শিশুর আগে থেকেই হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যা থাকায় সংক্রমণ আরও বিপজ্জনক হয়েছে।
হাসপাতালের শয্যা সংকটও পরিস্থিতি জটিল করছে। হামের জন্য বরাদ্দ ৮টি শয্যা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে হাসপাতালে ৮৬ জন রোগী ভর্তি। এর মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। অতিরিক্ত রোগী থাকার কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রাখার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। একই ওয়ার্ডে হাম, চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়া রোগীদের একত্রে রাখা হচ্ছে, যা নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে।
ডা. শ্রীবাস পাল হামের লক্ষণ ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রথম তিন-চার দিনে জ্বর, শরীর ব্যথা, সর্দি ও কাশি দেখা দেয়। এরপর চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা যায়। মুখের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ লক্ষ্য করলে হাম শনাক্ত করা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক; র্যাশ বের হওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে শিশুটি সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের একত্রে রাখা হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, অন্যান্য হাসপাতাল থেকে ভর্তি আসা রোগীর চাপের কারণে বাধ্য হয়ে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। শিশুর জীবন রক্ষায় দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
হামের সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার বিবেচনায় জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) জরুরি সভা করেছে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, নিয়মিত কর্মসূচির বাইরে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা প্রদান করা হবে।
গত তিন মাসে হাসপাতালের ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে ২৫ জন শিশু ভর্তি হলেও কোনো মৃত্যু ঘটেনি। ফেব্রুয়ারিতে ৮৮ জন ভর্তি হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মার্চের ৩০ তারিখ পর্যন্ত ৪৫৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছেন এবং ২২ জন মারা গেছেন। হামের পাশাপাশি অন্যান্য সংক্রামক রোগ ও জটিলতা শিশুর মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে।
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে পাঁচ মাস বয়সী শিশু মিনহাজ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৬ বছর বয়সী মাহিনসহ অনেক শিশু শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। একই ওয়ার্ডে ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে আসা মরিয়ম এবং নরসিংদী থেকে আসা জেসিকা চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, বিভিন্ন সংক্রামক রোগের রোগীদের একত্রে রাখলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চিকিৎসকরা শিশুদের হামের টিকা সময়মতো দেওয়ার গুরুত্ব পুনরায় গুরুত্বারোপ করেছেন। দ্রুত সঠিক চিকিৎসা এবং বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।