আইন আদালত ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবিতে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের শুনানি আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের কার্যতালিকায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার জজ আদালত শুনানির জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে মামলাটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন দাখিল করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দেওয়া রায়ে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই অভিযোগেও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সাজা বৃদ্ধির আবেদন করে। আপিল আবেদনে দণ্ড বৃদ্ধি চেয়ে আটটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে এক অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে সহযোগিতা করায় তাকে পাঁচ বছরের লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট সময়ে সংঘটিত সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ করে, সে সময় সংঘটিত ঘটনাগুলো পরিকল্পিত ও সংগঠিত ছিল এবং এতে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ছিল। ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথি এবং উপস্থাপিত যুক্তি বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো প্রমাণিত বলে রায় দেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশত্যাগ করেন বলে সরকারিভাবে জানানো হয়। এরপর থেকে তারা পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের বিধান অনুযায়ী অনুপস্থিত আসামির বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চালানো সম্ভব হওয়ায় মামলার শুনানি ও রায় ঘোষণা সম্পন্ন হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগের এই শুনানি মামলার পরবর্তী আইনি গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আপিল বিভাগ চাইলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখতে, সংশোধন করতে বা বাতিল করে নতুন নির্দেশনা দিতে পারেন। বিশেষত, দণ্ড বৃদ্ধির প্রশ্নে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।
মামলাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিচার, অন্যদিকে দণ্ড নির্ধারণ নিয়ে আপিল—উভয় দিক থেকেই এটি নজিরবিহীন ঘটনা।
আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি উপস্থাপন করবেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণার জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন অথবা যুক্তিতর্ক সমাপ্ত হলে রায়ের দিন ধার্য করতে পারেন। মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।