আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য এ হামলা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে এবং তা পূর্বের সীমিত অভিযানের তুলনায় ব্যাপক ও বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলও যুক্ত হতে পারে। যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে মিসাইল ও বিমান হামলা চালানোর পরিকল্পনা বিবেচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এতে ইরানের সরকারি কাঠামো ও সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। সে সময় ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই ঘটনার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বিকল্প বিবেচনায় নেয় বলে জানা গেছে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি হামলার পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনা ও সামরিক প্রস্তুতির সমান্তরাল কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্ভাব্য হামলার মাত্রা ও সময় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা বেড়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকোফ ও জের্ড ক্রুসনারের প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানান আরাগচি। ফলে সমঝোতার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তারা সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইসরায়েলের লক্ষ্য ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানো। কিছু সূত্রে বলা হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই হামলা শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনা ধরে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের একটি সূত্র দাবি করেছে, বিমান হামলার সম্ভাবনা বর্তমানে অত্যন্ত বেশি। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই হামলার সময়সূচি বা কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য এ সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক দেশ। দেশটির বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান শুরু হলে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। লেবানন, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা রয়েছে, যা সম্ভাব্য সংঘাতকে বিস্তৃত আকার দিতে পারে।
বর্তমানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও সামরিক প্রস্তুতি এবং পারস্পরিক অবস্থান কঠোর হওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।