খাদ্যশস্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক অগ্রগতি; মাঠ থেকে পাতে পৌঁছানোর আগেই প্রতি বছর লাখো টন খাদ্য নষ্ট হওয়া; বাসাবাড়ি, অনুষ্ঠান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের অপচয়; একই সময়ে ১ কোটি ৫৩ লাখেরও বেশি মানুষের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, যার মধ্যে ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি পরিস্থিতিতে। এর সবই বাংলাদেশের একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন চিত্র।
খাদ্য সংকট বিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, তীব্র খাদ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু চলতি পথে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া খাবার কিংবা পত্রিকার পাতায় ‘নষ্ট হচ্ছে ফসল’ শিরোনাম এই বাস্তবতারই প্রতিদিনের দৃশ্য।
স্বাধীনতার পর থেকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষেই এক বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। ৫১ বছরের ব্যবধানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১১ লাখ টনে। অর্থাৎ প্রায় ৩৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা কৃষিখাতে এক অভাবনীয় সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করে।
অথচ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল, জাতিসংঘ শিশু তহবিল, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা, ২০২৬’ অনুযায়ী, এই একই দেশে ২০২৩-২৫ সময়কালে ৪ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ২৬ দশমিক ২ শতাংশ) মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন এবং প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ মানুষ অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণজনিত অপুষ্টিতে ভুগছেন।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিকতা ও বহুমুখী আর্থসামাজিক সংকট, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী থেকে জনগোষ্ঠী ভেদে আরও গভীর হয়ে ওঠে।
উৎপাদনের সাফল্যের পাশে তাই খাদ্যক্ষয় ও অপচয়ের চিত্রটি আরও বেশি চোখে লাগে।
বিশ্বজুড়েও চিত্রটি একই রকম। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ‘খাদ্য অপচয় সূচক প্রতিবেদন ২০২৪’ অনুযায়ী, ভোক্তার কাছে পৌঁছানো খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই অপচয় হয়, যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রতিবেদনটি এই অপচয়কে সরাসরি ‘বৈশ্বিক ট্র্যাজেডি’ বলেছে। শুধু বাসাবাড়িতেই প্রতিদিন ১০০ কোটির বেশি বেলার খাবার অপচয় হয়, যা দিয়ে বিশ্বের ক্ষুধার্ত প্রায় ৭৮ কোটি মানুষের প্রত্যেককে প্রতিদিন একবেলার বেশি খাওয়ানো সম্ভব।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয়’ যদি একটি দেশ হতো, তাহলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর এটিই হতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী।
খাদ্যক্ষয় ও খাদ্য অপচয় শব্দ দুটি প্রায়ই একসঙ্গে ব্যবহৃত হলেও এদের অর্থ আলাদা। কোনো খাদ্যপণ্য উৎপাদন, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ কিংবা পরিবহনের ধাপে, অর্থাৎ খুচরা বাজারে পৌঁছানোরও আগে নষ্ট হয়ে গেলে তাকে বলা হয় খাদ্যক্ষয়। এর পেছনে মূলত দায়ী থাকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যেমন: সংরক্ষণাগারের অভাব, দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
আর খুচরা বাজার, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কিংবা ভোক্তা পর্যায়ে খাওয়ার উপযোগী খাবার পরিবেশনের আগে বা পরে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হলে তাকে বলা হয় খাদ্য অপচয়। এখানে দায় মূলত আচরণগত। যেমন: প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না, পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা কিংবা মেয়াদের প্রতি অসচেতনতা।
সহজ কথায়, সরবরাহ শৃঙ্খলের গোড়ায় যা হারিয়ে যায় তা ক্ষয়; আর শেষ প্রান্তে গিয়ে যা ইচ্ছাকৃত বা অসচেতনভাবে ফেলে দেওয়া হয় তা অপচয়।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট ফল ও শাকসবজির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশে এ হার পণ্য ও গবেষণা ভেদে ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ।
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আয়োজিত ২০২৪ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশে ফল ও সবজির বার্ষিক ক্ষয় ও অপচয় ৪০ দশমিক ২ শতাংশ বলা হয়েছে, যা বৈশ্বিক হারের কাছাকাছি। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে দেশে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশই ক্ষয় বা অপচয় হয়।
বাংলাদেশে খাদ্যক্ষয়ের বড় অংশ ঘটে মাঠ থেকে ফসল বাজারে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পর্যায়ে। ফল ও সবজির মতো পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণে দেশে পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, আর উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে খাদ্যের পচনশীলতাও তুলনামূলক বেশি। সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পুরনো, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফসলে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা ও অনুপযোগী অবকাঠামোর কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন এবং আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন। ফসলের দাম পড়ে গেলে অনেক সময় হতাশ কৃষক প্রতিবাদ হিসেবে নিজের ফসল নিজেই নষ্ট করেন।
ভোক্তা পর্যায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ইউএনইপি-র একই সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাসাবাড়িতে মাথাপিছু বার্ষিক খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ ৮২ কেজি। আর এই অপচয় মানে কেবল খাদ্যেরই অপচয় নয়, এর সঙ্গে অপচয় হয় উৎপাদনের অর্থ, শ্রম, পানি ও জ্বালানির মতো সম্পদ। বাসাবাড়ির খাবার টেবিল, শহরের রেস্তোরাঁ কিংবা বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের বিলাসী আয়োজনে খাদ্য নষ্ট হচ্ছে।
মানুষের অতিরিক্ত খাদ্য কেনার প্রবণতা, সঠিক সংরক্ষণ-ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সমাজে নিজের বিত্ত জাহির করার মানসিকতা থেকে অপচয়ের এক দুরভ্যাস গড়ে উঠেছে। গ্রামাঞ্চলে অপচয় হওয়া খাবারের কিছু অংশ অন্তত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু শহরের উচ্ছিষ্ট খাবার সরাসরি গিয়ে পড়ে ডাস্টবিন বা ময়লার ভাগাড়ে।
নগরের ডাস্টবিন ও বর্জ্য ফেলার স্থানগুলোতে প্রতিদিন জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খাবার সামাজিক অসমতা ও কাঠামোগত অপচয়ের এক নির্মম বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। এই খাবারের একটি বড় অংশ ফেলে দেওয়ার আগে চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। অতিরিক্ত মজুত ও ব্যবহারিক অসচেতনতার কারণে বাসাবাড়িতেও পচনশীল খাদ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়। সমাজের কোনো কোনো অংশ প্রয়োজনাতিরিক্ত ভোগ করে। অথচ অন্যরা তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়।
এই ভারসাম্যহীনতা অপচয় বাড়ায় এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে দুর্বল করে তোলে। যে দেশে কোটি কোটি মানুষের প্লেটে পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছায় না, সেখানে এই বিপুল অপচয় স্পষ্টতই এক চরম নিষ্ঠুরতা ও বিলাসিতা।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় ডায়াগনস্টিক-২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ক্ষয় ও অপচয় হওয়া খাদ্য উৎপাদনেই দেশের প্রায় ৩৪ হাজার বর্গকিলোমিটার জমি ব্যবহৃত হয়, যা মোট কৃষিভূমির প্রায় ২৭ শতাংশ। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী এই খাদ্যক্ষয় ও অপচয়। এই সাংঘর্ষিক বাস্তবতা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের খাদ্য সংকট উৎপাদন-স্বল্পতার সংকট নয়; এটি বণ্টন, ব্যবস্থাপনা, ন্যায্যতা ও অধিকারের সংকট।
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয় বিষয়ক আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘খাদ্যক্ষয় ও অপচয় হ্রাসের রূপান্তরমূলক সম্ভাবনা’।
খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমানো গেলে ত্রিমুখী সুফল পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির উন্নয়ন; দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং তৃতীয়ত, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন।
এই কারণেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২-এর অধীনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য (১২.৩) নির্ধারণ করা হয়েছে—২০৩০ সালের মধ্যে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে খাদ্যক্ষয় কমানো।
কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, আমরা এই লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে কতটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করা এবং দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রণীত জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০-এ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় রোধে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে উপযুক্ত সময়ে ফসল কাটা ও সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ফসল কাটার পর প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, মোড়কীকরণ, বাজারজাতকরণ ও খাদ্যের উচ্ছিষ্ট পুনর্ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান বিস্তার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে জাতিসংঘ খাদ্যব্যবস্থা সম্মেলনের পর্যালোচনা সভায় জমা দেওয়া ‘জাতীয় পথনকশা, জুলাই ২০২৫’-এ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমাতে একটি পৃথক জাতীয় কৌশল প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীতিগত প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন নীতির বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। এই বাস্তবতায় ‘বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানি’ খাদ্যক্ষয় ও অপচয় কমিয়ে সবার খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত সুপারিশ তুলে ধরছে—
১. কৃষকের জন্য সহজলভ্য হিমাগার ও সংগ্রহোত্তর সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। ফসল কাটা, মাড়াই ও সংরক্ষণে উন্নত পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহন ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
২. কৃষকদের সময়মতো বাজারদর ও চাহিদার তথ্য দিতে হবে, যাতে দাম পড়ে যাওয়ার কারণে ফসল মাঠেই নষ্ট না হয়।
৩. মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কেনা ও রান্না করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত খাবার আয়োজনের বদলে অপচয় কমানোর চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
৪. উদ্বৃত্ত কিন্তু খাওয়ার উপযোগী খাবার খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে মর্যাদার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য খাদ্যদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আইনি সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে।