দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার মেঘাচ্ছন্ন বনাঞ্চলে (ক্লাউড ফরেস্ট) ছোট আকারের এক বুনো বিড়ালের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এটিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর 'বিড়াল' পরিবারের সম্পূর্ণ অজানা কোনো প্রজাতির আনুষ্ঠানিকভাবে নামকরণ করা হলো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই বুনো বিড়ালটি 'তিলকায়ো' নামে পরিচিত। দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে দেখা মেলা 'টাইগার ক্যাট' পরিবারের সদস্য এটি।
গবেষকরা জানান, বলিভিয়ার সবুজ ও দুর্গম ইয়ুঙ্গাস বনাঞ্চলে বিড়ালটির দেখা মেলে। পার্বত্য এই অঞ্চলের বনভূমিগুলো ঘন মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে এবং সেখানকার বাতাসে আর্দ্রতাও অনেক বেশি। প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ১ দশমিক ৪ কেজি। আকৃতির দিক থেকে এটি আমাদের চেনা সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও ছোট।
জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি একেবারেই নতুন একটি প্রজাতি। স্থানীয় নামের সঙ্গে মিল রেখে গবেষকেরা এর বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন 'লেপার্ডাস তিলকায়ো' (Leopardus tilcayo)।
বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান সাময়িকী 'কারেন্ট বায়োলজি'তে নতুন শনাক্ত হওয়া এই প্রজাতি সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার পাওলা নোগালেস-অ্যাসকারুনজ বলেন, 'এর গায়ের পশমের রং হালকা বাদামি এবং সারা শরীরজুড়ে রয়েছে অনিয়মিত আকারের গোলাপের পাপড়ির মতো ছোপ ছোপ দাগ (রোজেট)।'
এই বুনো বিড়ালটির জীবনযাপন ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। নোগালেস-অ্যাসকারুনজ জানান, বিড়ালটির মলের নমুনায় ছোট ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলোই হয়তো তাদের খাদ্যের অংশ। অন্যদিকে ক্যামেরা ট্র্যাপে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রাণীটি সম্ভবত রাতের বেলা বেশি সক্রিয় থাকে।
গবেষণাপত্রের আরেক প্রধান লেখক ও বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি অব অ্যান্টওয়ার্পের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী জোনাস লেসক্রোয়া জানান, টাইগার ক্যাট মূলত 'ক্রিপ্টিক প্রজাতি'র অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ হলো, কেবল বাহ্যিক রূপ দেখে এদের সহজে অন্যান্য প্রজাতি থেকে আলাদা করা যায় না।
অতীতে টাইগার ক্যাটকে একটি একক প্রজাতি হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। তবে কয়েক দশক আগে জিনগত গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে যে এদের একাধিক প্রজাতি রয়েছে।
নতুন এই প্রজাতির বিষয়ে লেসক্রোয়া বলেন, 'এই মুহূর্তে আমাদের তথ্য দুটি জীবিত প্রাণীর পর্যবেক্ষণ এবং ক্যামেরা ট্র্যাপে পাওয়া অল্প কয়েকটি রেকর্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।'
গবেষকদের পরীক্ষা করা জীবিত বিড়াল দুটির একটি হলো ১০ বছর বয়সী পুরুষ বিড়াল। স্থানীয় এক পরিবার এটিকে তাদের বাড়িতে রেখেছিল। বর্তমানে বিড়ালটি বলিভিয়ার 'সেন্দা ভের্দে ওয়াইল্ডলাইফ স্যাঙ্কচুয়ারি'তে রয়েছ
নোগালেস-আসকারুনস বলেন, বলিভিয়ার বিড়ালটি নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ তৈরি হয়, কারণ 'এর বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে প্রচলিত বর্ণনা মিলছিল না। আর ওই বর্ণনাগুলোর বেশির ভাগই ব্রাজিলের বিড়ালকে ভিত্তি করে তৈরি। এতে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—বলিভিয়ায় আসলে আমাদের হাতে থাকা টাইগার ক্যাটটি কোন প্রজাতির?'
গবেষক দলটি দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ৩৮টি বিড়ালের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে। এসব নমুনার মধ্যে জাদুঘরে সংরক্ষিত আটটি নমুনাও ছিল। গবেষণায় দেখা যায়, টাইগার ক্যাট আসলে জিনগতভাবে স্বতন্ত্র পাঁচটি প্রজাতিতে বিভক্ত।
লেসক্রোয়ার বলেন, 'আমরা কখনো আশা করিনি যে এই বলিভিয়ান টাইগার ক্যাটটি আলাদা একটি প্রজাতি। এর আগে কেউ এটিকে আলাদা প্রাণী, উপপ্রজাতি বা অন্য কোনো শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করার কথাও বলেনি।'
জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিলকায়ো বংশধারাটি প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে অন্যান্য টাইগার ক্যাট থেকে আলাদা হয়ে যায়।
লেসক্রোয়ার বলেন, 'তাদের ডিএনএতে যত বেশি পার্থক্য থাকে, আমরা ধারণা করি, ওই বংশধারাগুলো তত দীর্ঘ সময় ধরে আলাদাভাবে বিকশিত হয়েছে।' তিনি বলেন, বিড়ালের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতাকে সাধারণত আলাদা প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষক দলটি পেরুর ইউনগাস অঞ্চলে টাইগার ক্যাটের আরও একটি নতুন উপপ্রজাতির বর্ণনা দিয়েছে। প্রাচীন ইনকা সাম্রাজ্যের যে অঞ্চলটিতে এদের আবাসস্থল ছিল, সেই আনতিসুইউয়ের নাম অনুসারে উপপ্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে 'লেপার্ডাস টাইগ্রিনাস আনতিসুইউ' (Leopardus tigrinus antisuyo)।
প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থা পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) রেড লিস্টে টাইগার ক্যাটকে বর্তমানে দুটি 'ঝুঁকিপূর্ণ' প্রজাতি হিসেবে ধরা হয়। এসব প্রজাতির সংখ্যা কমছে।
গবেষকেরা তাদের গবেষণার তথ্য আইইউসিএনের কাছে দিয়েছেন। সংস্থাটির পরবর্তী পর্যালোচনায় টাইগার ক্যাটের পাঁচটি বংশধারার অবস্থা আলাদাভাবে দেখা হবে। লেসক্রোয়ার বলেন, এতে প্রতিটি প্রজাতি কতটা ঝুঁকিতে আছে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে। আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলে তিলকায়োর মতো কিছু প্রজাতিকে 'বিপন্ন' ঘোষণা করা হতে পারে।
ইউনগাস অঞ্চলে এ ধরনের মূল্যায়ন আরও জরুরি। কারণ, দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলের বন ও প্রকৃতি এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।
নোগালেস-আসকারুনস বলেন, পাহাড়ি বনগুলো বন উজাড়, কৃষিজমি বাড়ানো, মানুষের লাগানো আগুন ও খননকাজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া বন ফিরিয়ে আনা, বাকি প্রাকৃতিক বন রক্ষা করা এবং বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা এখন জরুরি।
ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের বিবর্তনবিষয়ক জীববিজ্ঞানী এবং গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক এদুয়ার্দো আইজিরিক বলেন, 'বিড়ালের মতো পরিচিত প্রাণীর মধ্যেও যে এখনো নতুন প্রজাতি পাওয়া যাচ্ছে, তা মানুষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।'
তিনি বলেন, 'বিশ্বে এখনো অনেক প্রজাতি আছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না। আমরা সেগুলো আবিষ্কার করার আগেই হয়তো অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।'
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.