ধর্ম ডেস্ক
মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান মৌলিক চিন্তা ও চালিকাশক্তি হলো রিজিক। জীবিকা নির্বাহ, পরিবারের প্রয়োজন পূরণ এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নিয়ে মানুষের মনে নানা ধরনের ভাবনা ও উদ্বেগ কাজ করা স্বাভাবিক। তবে ইসলামি জীবনব্যবস্থায় রিজিকের ধারণা কেবল পার্থিব ধন-সম্পদ বা ব্যাংক ব্যালেন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, সুস্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, নেক সন্তান, পরিবার, ঈমান ও জ্ঞান—সবকিছুই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। একজন মুমিনের মৌলিক বিশ্বাস হলো, রিজিকের প্রকৃত মালিক কোনো সৃষ্টি নয়, বরং মহান আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’
মহান আল্লাহর ওপর এই পূর্ণ বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে। ইসলাম একদিকে যেমন আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল বা ভরসা করার শিক্ষা দিয়েছে, অন্যদিকে হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা ও কর্মতৎপরতা চালানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ই একজন মানুষের জীবনে প্রকৃত ভারসাম্য আনয়ন করে। ইসলামে কর্মবিমুখতার কোনো স্থান নেই; বরং প্রচেষ্টা এবং বিশ্বাসের মেলবন্ধনেই রিজিকের পথ প্রসারিত হয়।
ইসলামিক জীবনদর্শনে রিজিক বৃদ্ধির বেশ কিছু কার্যকর উপায় ও মাধ্যমের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য সকল সংকট থেকে উত্তরণের পথ সহজ করে দেন এবং এমন উৎস থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন যা সে কল্পনাই করতে পারে না। জীবনের নানা সংকটে যখন পার্থিব সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে মনে হয়, তখন তাকওয়া ও পরহেজগারি অলৌকিক উপায়ে জীবিকার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসার প্রকৃত অর্থ নিষ্ক্রিয়তা নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, পাখিরা যেমন সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয়ে সন্ধhrে ভরা পেটে ফিরে আসে, তেমনি মানুষকেও জীবিকার সন্ধানে সক্রিয় হতে হয়। তাওয়াক্কুল হলো অন্তরের বিশ্বাস, আর চেষ্টা হলো শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। এই দুটির যৌথ অনুশীলনেই সাফল্য আসে। এছাড়া বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার রিজিকের বরকত বৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। সুরা নুহ-এ বর্ণিত হয়েছে যে, ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহ প্রাচুর্যময় বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দান করেন।
ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কও রিজিকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে আয়ু ও রিজিক বৃদ্ধি পায় বলে হাদিসে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একইভাবে, দান-সদকা বা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করলে সম্পদ কমে যায় না, বরং এর বরকত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ইসলাম মানুষকে সকালের বরকত গ্রহণের জন্য ভোরে কর্মক্ষেত্রে বের হওয়ার তাগিদ দিয়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও কল্যাণকর।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে রিজিকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো উপার্জন যেন সম্পূর্ণ হালাল হয়। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি ও আত্মসাতের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য দিলেও তাতে কোনো বরকত থাকে না এবং তা দুনিয়া ও আখিরাতে ধ্বংসের কারণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র বস্তু ও উপার্জনই কবুল করেন। তাই বস্তুগত অর্জনের পাশাপাশি আত্মিক শুদ্ধতা ও হালাল অনুসরণের মাধ্যমেই প্রকৃত রিজিক নিশ্চিত করা সম্ভব।