আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু সংকট, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক সরবরাহব্যবস্থায় তীব্র বিঘ্নের কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগস্ট মাসে সূচকটি টানা তৃতীয় মাসের মতো বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। এর আগে জুলাই মাসে এই সূচকটি সংশোধিত আকারে ১৩০ দশমিক ৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। বর্তমান এই সূচকটি ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে সর্বোচ্চ অবস্থান নির্দেশ করছে। তবে ২০২২ সালের মার্চ মাসে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর ঠিক পরপরই বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের যে রেকর্ড দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল, আগস্ট মাসের এই সূচকটি তার তুলনায় এখনো প্রায় ১৭ শতাংশ নিচে রয়েছে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো এই পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার এই প্রবণতা বাজার অর্থনীতির জন্য নতুন করে ঝুঁকির সতর্কবার্তা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ফাটল একসঙ্গে যুক্ত হয়ে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগস্ট মাসে এফএওর খাদ্যমূল্য সূচকের আওতাভুক্ত প্রধান পাঁচটি খাতের প্রতিটিতেই—অর্থাৎ শস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে ভুট্টা ও চিনিবিটের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে গবাদি পশুর খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
পাশাপাশি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়ার প্রভাবে এশিয়া মহাদেশজুড়ে পাম তেল ও আখের উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগস্ট মাসে বিশ্ববাজারে শস্যের মূল্যসূচক এক মাসের ব্যবধানে ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে চিনির বাজারে। আগস্ট মাসে এফএওর চিনি মূল্যসূচক এক লাফে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে গিয়ে ঠেকেছে। ব্রাজিলের প্রধান মধ্য-দক্ষিণ অঞ্চলে উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া এবং ইউরোপ ও এশিয়ায় প্রতিকূল আবহাওয়া এই মূল্যবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে পূর্ব ইউরোপে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় নৌপথ দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা ও হামলার তীব্রতা বাড়ায় দুই দেশ থেকেই শস্য রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে কৃষিকাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সারের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাও সংকটের মুখে পড়েছে।
সার্বিক এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতি বিবেচনা করে এফএও ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাসও সংশোধন করে কমিয়ে এনেছে। সংস্থাটির জুলাই মাসের পূর্বাভাসের তুলনায় নতুন প্রতিবেদনে উৎপাদনের পরিমাণ ৩৪ লাখ মেট্রিক টন কমিয়ে মোট ২৯৮ কোটি টন নির্ধারণ করা হয়েছে।