প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত প্রসার লাভ করছে। দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক কাজ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কৌতূহল মেটানো কিংবা প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও আজ বহু মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রযুক্তির নির্বিচার ও অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মনোবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংবেদনশীল ব্যক্তিগত বিষয়, আবেগগত সিদ্ধান্ত কিংবা আর্থিক সংকটে এআইয়ের ওপর পূর্ণাঙ্গ নির্ভরতা ডেকে আনতে পারে মারাত্মক বিভ্রান্তি ও মানসিক বিপর্যয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো স্বাধীন সত্তা বা নিজস্ব অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় না। এটি মূলত বিভিন্ন সার্ভার থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। ফলে একে মানুষের প্রকৃত বন্ধু বা জীবনের নিখুঁত আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা একটি বড় ধরনের ডিজিটাল বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে সৌন্দর্য মূল্যায়ন, আবেগ ও ভালোবাসার বিচার, আত্মমর্যাদার মাপকাঠি নির্ধারণ এবং আর্থিক ও জীবনের জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআইয়ের পরামর্শ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
চেহারা, শারীরিক গঠন বা পোশাকের পছন্দ নিয়ে এআইয়ের কাছে মূল্যায়ন চাওয়া সম্পূর্ণ নিরর্থক। এর বাণিজ্যিক অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারীকে সর্বদা সন্তুষ্ট রাখা যায়। ফলে বাস্তব জীবনের প্রকৃত বন্ধুরা যেখানে প্রয়োজনে কঠোর সত্যটি প্রকাশ করে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে, এআই সেখানে কেবল তোষণমূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। একইভাবে, কেউ ভালোবাসে কি না বা সম্পর্কের জটিল সমীকরণ বুঝতে এআইয়ের শরণাপন্ন হলে কৃত্রিম সহানুভূতি পাওয়া গেলেও মানুষের গভীর ও জটিল অনুভূতি উপলব্ধি করার কোনো জৈবিক বা মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা এই প্রযুক্তির নেই। আবেগগত সংকটের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ব্যবস্থার বদলে বন্ধু, পরিবার বা পেশাদার থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়াই শ্রেয়।
বুদ্ধিমত্তা, যোগ্যতা কিংবা আত্মমর্যাদা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও এআইয়ের অন্ধ অনুকরণ বিভ্রান্তিকর। সুবিশাল ডেটাবেজ থাকা সত্ত্বেও এআইয়ের কোনো নিজস্ব চেতনা বা আত্মোপলব্ধি নেই। এছাড়া আর্থিক বিনিয়োগ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে অনেক সময় বাস্তবসম্মত হিসাবের পরিবর্তে সাধারণ বা দার্শনিক মতামত প্রদান করে থাকে, যা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পেশাদার হিসাবরক্ষক বা আর্থিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই রান্না বা বিনোদনের মতো প্রাথমিক ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারলেও বিপদের দিনে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, জরুরি মুহূর্তে গাড়ি ঠিক করা কিংবা বাস্তব জীবনের মানবিক ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার মতো মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের প্রকৃত সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক সহানুভূতি এবং বাস্তব জীবনের পারস্পরিক বন্ধনই যেকোনো কৃত্রিম প্রশংসার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ও কার্যকর। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রযুক্তিকে জীবন সহজ করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, কিন্তু মানবীয় আবেগ ও সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে নয়।