চট্টগ্রাম — জেলা প্রতিনিধি
বাংলাদেশের নৌ-বাণিজ্যিক অবকাঠামো আধুনিকায়নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে ৫৫ কোটি মার্কিন ডলার (৫৫০ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের নকশা ও পরিচালনার রূপরেখা প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় নির্মিতব্য এই প্রকল্পটি শেষ হলে এটিই হবে দেশের প্রথম শতভাগ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা কনটেইনার টার্মিনাল। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ মূল নির্মাণকাজ শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই অবকাঠামো যুক্ত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং বার্ষিক ৮ লাখ টিইইউ-র (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) বেশি কনটেইনার বাড়তি হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত প্রকৌশল নকশা অনুযায়ী, ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিসম্বলিত এই টার্মিনালে ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। এতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার টায়ারযুক্ত গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজিএস) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর (ইটিটিএস) সংযোজন করা হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ২,৭০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার ফিডার জাহাজ ভিড়তে পারে। তবে লালদিয়া টার্মিনাল চালুর পর প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৬,০০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার মেইনলাইন কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লজিস্টিকস ব্যয় ও লিড টাইম (পণ্য সরবরাহ সময়) কমানোর ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে বড় জাহাজ ভিড়তে না পারায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো আঞ্চলিক হাবগুলোতে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ছোট ফিডার জাহাজে পরিবহন করতে হয়, যা সরবরাহ চেইনে অতিরিক্ত ৭ থেকে ১৪ দিন সময় এবং বিপুল খরচ বাড়ায়। সরাসরি মেইনলাইন ভেসেল নোঙ্গরের সুবিধা তৈরি হলে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলোর সাথে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে। এটি মূলত দেশের তৈরি পোশাক খাত, ওষুধ, চামড়া ও পাদুকা শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।
বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর মতে, এই বিনিয়োগটি আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে চট্টগ্রামের অবস্থান শক্তিশালী করবে এবং বৈশ্বিক হাবগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাবে। আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনা কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বন্দরের বিদ্যমান কনটেইনার জট হ্রাস পাবে এবং অন্যান্য টার্মিনালগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধিতেও এটি একটি বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি পরিচালন চুক্তির অধীনে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পটিকে বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং সরাসরি বৈশ্বিক বাণিজ্য সংযোগ স্থাপনে অন্যতম প্রধান মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।