বিশেষ প্রতিবেদক
বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে মধ্যস্থতা একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, আদালতের বাইরে বিকল্প উপায়ে কার্যকর মধ্যস্থতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে দেশের বিচার বিভাগে বর্তমানে বিচারাধীন থাকা প্রায় ৪৫ লাখ মামলার জট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘আইন পেশাজীবীদের জন্য মৌলিক মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্যস্থতা এবং দেওয়ানি মামলা পরিচালনা পদ্ধতির উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে দরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার নাগরিকদের জন্য সহজে ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার (লিগ্যাল এইড) মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সেবা নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন মামলা চললে পক্ষগুলোর প্রচুর সময় ও অর্থ অপচয় হয়, যা মানুষকে তীব্র মানসিক ও শারীরিক উদ্বেগের মধ্যে ফেলে। তাই হত্যা বা অন্যান্য গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া সাধারণ অধিকাংশ দেওয়ানি ও পারিবারিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
আইন পেশায় সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, অনেকেই ধারণা করেন আইনজীবীরা সমঝোতার বিপক্ষে থাকেন, যা সঠিক নয়। দেশে ও বিদেশে সফল বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনজীবীরাই প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে দেশে আইনি পেশায় মধ্যস্থতার সংস্কৃতি জনপ্রিয় হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কেবল আইনি জ্ঞান থাকলেই একজন ভালো মধ্যস্থতাকারী হওয়া যায় না; এর জন্য প্রয়োজন মানবিকতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির সক্ষমতা। মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার জন্য তিনি জাপানি সাহিত্যের বিখ্যাত একটি গ্রন্থের উদাহরণ টেনে নিরপেক্ষ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গুণগত মান ও অনুপ্রেরণা বাড়াতে একটি বিশেষ উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের অধীনে সেরা কর্মদক্ষতা প্রদর্শনকারী একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উচ্চতর ও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রদান করা হবে। এই পদক্ষেপটি মধ্যস্থতাকারীদের আরও বেশি দক্ষ, পেশাদার, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে তিনি বন্ধুপ্রতীম দেশ জাপানের সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা এবং প্রশিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে দুই দেশের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ও উন্নয়ন সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করেন এবং দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বাড়াতে সরাসরি আকাশপথের ফ্লাইট বৃদ্ধিতে গুরুত্ব প্রদান করেন।
প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেমউল কায়েসের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জাইকা বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধি জুনকো তাকাহাশি, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের (আইসিডি) উপমহাপরিচালক কাজুনোরি নোসে এবং বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন।
দুই দিনব্যাপী এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত লিগ্যাল এইড অফিসার এবং জেলা জজ আদালতে কর্মরত আইনজীবীদের মধ্য থেকে মোট ৪০ জন বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় মধ্যস্থতা পদ্ধতির মৌলিক নীতি, আধুনিক যোগাযোগ কৌশল, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা পরিচালনার দক্ষতা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) ব্যবহারিক কৌশল নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে মূল প্রশিক্ষক হিসেবে সেশন পরিচালনা করেন জাপানের কেইও ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞ মাসাকো মিয়াতাকে, যিনি জাপানের সফল অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তুলে ধরেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারালয়ে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। জাইকার সহায়তায় পরিচালিত এই যৌথ প্রকল্প বাংলাদেশে মধ্যস্থতা কাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং সাধারণ জনগণের দ্রুত justice access বা ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের পথ সুগম করবে।